কলমেঃআফসানা শোভা
[ এই গল্পের কোন থিম,প্লট কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। ⛔]
– ম্যাডাম।
কথা কম্পিউটারে মুখ ডুবিয়ে ছিল। কারো মৃদু ডাকে ও মাথা তুলে তাকায়। দেখে অফিসের পিয়ন রহিম কাকা হাতে একটা মোটা মতন ফাইল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কথা স্তিমিত স্বরে বললো,
– কিছু বলবেন কাকা?
কথার কন্ঠে ‘কাকা’ ডাকে রহিম বেশ প্রসন্ন হলেন। এর আগে কোন ম্যাডাম, স্যার ওনাকে কাকা বলে ডাকেনি। রহিম, পিয়ন বলেই সবাই সম্বোধন করে। হঠাৎ এই নতুম ম্যাডামটার মুখে কাকা ডাকে স্বভাবতই উনি খুশি হলেন। হাসিমুখে বললেন,
– স্যার বলেছেন এই ফাইলের সমস্ত ডাটা মিলিয়ে দেখতে।
কথার ললাটে হালকা ভাঁজ পড়ে। শুধায়,
– কোন স্যার, আয়ান স্যার?
– না না ম্যাডাম। ম্যানেজার স্যার না। বড় স্যার।
বড় স্যার বলতে কাকে বুঝিয়েছেন সেটা বুঝতে কথার সমস্যা হলোনা। কিন্তু মিষ্টার স্নিগ্ধ শাহরিয়ার কেন সবাইকে রেখে ওকেই একটা ভিন্ন কাজ দিল। তবুও উচ্চবাচ্য করলো না কথা। ও এখন স্নিগ্ধ শাহরিয়ারের একজন অধীনস্থ কর্মচারী মাত্র। সে কথাকে যে কাজই দিক না কেম্ন,কথা তা মানতে বাধ্য। একটা ক্ষীণ শ্বাস ছেড়ে কথা ফাইলটা নিল। তন্মধ্যে রহিম কাকা স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে ফের বলে উঠলেন,
– ম্যাডাম স্যার বলেছেন আধাঘন্টার মধ্যে কাজটা করে ফাইল জমা দিতে।
কথাটা বলে রহিম আর দাঁড়ালেন না। উনি যেতেই কথা
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ফাইলটা খোলে। কিন্তু ফাইলটা ওপেন করতেই ওর চক্ষু চড়কগাছ। ফাইলটাতে প্রায় হাজারখানের কোড সংখ্যা। কথার মাথা চক্কর কেটে উঠে। এতগুলো কোড ও মেলাবে কিনা মাত্র আধঘন্টায়? মগের মুল্লুক পেয়েছে নাকি? ফোঁসফোঁস করে কথা কতক্ষণ মনে মনে স্নিগ্ধকে গালাগাল করলো। স্নিগ্ধর গুষ্টি উদ্ধার শেষ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কথা কাজে লেগে পড়ে। কিন্তু কিছুতে মন বসাতে পারেনা। মনটা পড়ে আছে তার পুতুলটার কাছে। জন্মের পর থেকে এত লম্বা সময় সে তার পুতুলটাকে ছেড়ে থাকেনি। মেয়েটা কি করছে কে জানে? ফাইয়াজ বেলা বারোটা অব্দি স্কুলে থাকে, নাহলে এত চিন্তা হতোনা। কথা আরেকবার হাতঘড়ি দেখে নেয়। অলরেডি দশ মিনিট পার হয়ে গিয়েছে। প্রায় দেড়ঘটা লাগল কথার কোডগুলো মেলাতে। কথা হাঁফ ছেড়ে ঘড়ি দেখতেই সামান্য ভীত হলো। কারণ আধঘন্টার জায়গায় ও দেড় ঘন্টা লাগিয়ে দিয়েছে।
এমন না যে কাজে আলসেমি করেছে, এতগুলো কোড মেলাতে এক্সপার্টদেরও ঘন্টাখানেক লাগবে। কোন আক্কেলে দ্য গ্রেট স্নিগ্ধ শাহরিয়ার ওকে আধঘন্টা সময় দিয়েছে কে জানে? হয়তো কথাকে হয়রান করাই তার মূল উদ্দেশ্য। ক্ষীণ শ্বাস ছেড়ে ফাইলটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ায় কথা। মনে কিঞ্চিৎ ভয় নিয়ে হাঁটা দেয় ওর চির অপ্রিয় মানুষটার সম্মুখীন হতে।
.
স্নিগ্ধর কেবিনের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বুক ভরে প্রলম্বিত শ্বাস টেনে দরজায় নক করে। ভেতর থেকে কয়েক সেকেন্ডের মাথায় দারাজ গলায় উত্তর আসে,
– কাম ইন।
কথা ফাইলটা বুকে আঁকড়ে গায়ের ওরনা টেনেটুনে ঠিক করে কাঁচের দরজাটা ঠেলে ঢুকে। শীততাপ নিয়ন্ত্রিত অত্যাধুনিক রুমটায় একবার চোখ বুলিয়ে কাঙ্ক্ষিত মানুষটার দেখা মিলে। ওইতো বিশাল আকৃতির কাচ বেষ্টিত উইনডোর ধারে দাঁড়িয়ে আছে লম্বাটে বলিষ্ঠ দেহখানা। পরনের ধূসর প্যান্টের পকেটে একহাত গুঁজে কানে ফোন ঠেকিয়ে আছে। না চাইতেও কথার কানে আসে ফোনালাপের কিছু অংশ,
– বাবা, আজ বিকেলে সত্যি ঘুরতে নিও যাব। প্রমিস।
আচমকা কথার পায়ের জমিন থরথরিয়ে কেঁপে উঠল।
সারা শরীর যেন জমে বরফ হয়ে গেল। কলিজায় যেন কেউ বড়সড় আঘাত করেছে এরূপ যন্ত্রণা অনুভব হলো। রুদ্ধ ভীতিকর মস্তিষ্কে ভাবল, স্নিগ্ধ কি বিয়ে করে নিয়েছে? পরক্ষণেই নিজের উপর নিজেই রাগ অনুভব করলো। স্নিগ্ধ শাহরিয়ার বিয়ে করলেই বা কি? এই প্রতারকের সাথে ওর তো কোন সম্পর্ক অবশিষ্ট নেই। সে বিয়ে করে সংসার করতেই পারে, তাতে তার কিছু আসা যাওয়ার কথা না। কথা নিঃশব্দে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইল স্নিগ্ধ কথা শেষ হওয়া অব্দি।
স্নিগ্ধ ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে পেছনে ফিরতেই চমকে উঠে। ফাইল হাতে কথা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। কতগুলো বছর পর সেই প্রজ্জ্বলিত রূপবতী মুখটা দেখে ফের একবার আন্দোলিত হলো স্নিগ্ধর হৃদয় অঙ্গন। কথার পরনে হাঁটুসম স্কাই কালারের লং ফ্রক। গলায় সাদা ওরনা পেছানো। কোমরে নিচের ঝুলন্ত চুলগুলো কয়েক বছরে হাঁটু ছুঁয়েছে। সেই দীঘল কেশরাশিতে সর্পিলাকার বিনুনি গাঁথা।
সতেরো বছরের সেই ফুটফুটে কিশোরী মুখটায় এখন যৌবনের প্রলেপ। পুরো নারী শরীরে এখন অদম্য নয়া যৌবনের ঝংকার। একি সময়ে কথা বড্ড সাহস করে ওর ভাসা ভাসা চোখদুটো তুলে সরাসরি স্নিগ্ধর কালো-বাদামী মিশেলের চোখে তাকাল। অবুঝ মনে ভাবল হয়তো এই চোখদুটিতে পুরনো দিনের মতো মুগ্ধতা ঠিকরে পড়বে। কিন্তু স্নিগ্ধর ধারালো চোখদুটিতে নির্লিপ্ততা বৈ কিছুই খুঁজে পেলনা কথা।
কথার অনিন্দ্য সুন্দর মুখটায় স্নিগ্ধ পুরনো দিনের মতো মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে রইলনা। বরং বিতৃষ্ণ চোখদুটো সরিয়ে নিল। কথা মনে মনে কষ্ট পেলেও বুঝতে দিল না। একপলক চোরা দৃষ্টিতে তাকাল স্নিগ্ধর পানে। পরনের স্যুটটা ওর বলিষ্ঠ গতরে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে। চুলগুলো কয়েক বছর আগের মতো কিউট করে আর কপালে পড়ে নেই। সিল্কি চুলগুলো এখন জেল দিয়ে সজারুর মতো খাঁড়া করে সেট করে রাখা। ফোল্ড করে রাখা শার্টের ভেতর থেকে মাংসপেশি গুলো ফুলেফেঁপে বের হয়ে আছে। বোঝাই যাচ্ছে নিয়মিত চর্চায় অভ্যস্ত এই মাসেল যুক্ত হাতদ্বয়। কথা ওই হাতগুলো দেখে শুকনো ঢোক গিলে। এই বদমাইসটা এত হ্যান্ডসাম হলো কীভাবে? আর ও কিনা এর বিরহে নিজেকে পেত্নী বানিয়ে ফেলেছে ছিঃ।
দৃষ্টি নত করে ক্ষীণ স্বরে বললো,
– ফাইলটা রেডি।
– পুট দিজ অন টেবল এন্ড গেট আউট।
কথা বাকহারা হয়ে স্নিগ্ধর শক্ত মুখটায় চেয়ে রইল। অপমানে দীঘির মতো ভাসা চোখদুটোতে জল জমল। প্রখর নিয়ন্ত্রণে সেই অশ্রু ধারা কোটর টপকে বের হতে পারলোনা। আরেকবার স্নিগ্ধর প্রস্তরখন্ডের ন্যায় শক্ত মুখটায় চেয়ে নীরবে বের হয়ে গেল। কথা বের হতেই স্নিগ্ধ সামনে থাকা চেয়ারটায় সবেগে লাথি
কষাল। দৈবাৎ চেয়ারটা উল্টে পড়ল মেঝেতে। স্নিগ্ধর কালচে বাদামী চোখের মনিদুটে ততক্ষণে রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে। ফোঁসফোঁস করে কয়েকটা শ্বাস ছেড়ে ধুপধাপ পায়ে কেবিনের একপাশে থাকা মিনি ফ্রিজটার দিকে এগিয়ে গেল। ফ্রিজ খুলে বের করল ঠান্তা হুইস্কির বটল। গ্লাসে ঢালার প্রয়োজন বোধ করলনা, বটলের ছিপি খুলে লাল কড়া তরলগুলো ঢকঢক করে গিলতে লাগল অশান্ত হৃদয়কে সামান্য শীতলতা প্রদানের প্রচেষ্টায়।
*
অফিস শেষ হলো বিকাল পাঁচটায়। ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত কথা অফিস থেকে বের হয়ে হাঁটা দিল। উদ্দেশ্য হেঁটে হেঁটে বাস স্টেশন অব্দি যাওয়া। চাইলে রিকশা নেওয়া
খিদেয় পেট চোঁ-চোঁ করছে। হাত ফাঁকা তেমন টাকা নেই। আজ স্নিগ্ধতাকে ঘুরতেও নিয়ে যেতে হবে। মেয়েটাকে অনেকদিক কোথাও বের করা হচ্ছেনা। এভাবে চললে মেয়েটার মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি হতে পারে। কথা আনমনে হাঁটছিল হঠাৎ ওর পাশে একটা বাইক ব্রেক কষে। কথা আঁতকে উঠো দু’পা পিছিয়ে যায়। মুখ থেকে হেলমেট সরিয়ে তৌফিক মুচকি হাসে,
– অনন্যা, তোমার বাসা কোনদিকে, চলো তোমাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে আসি।
প্রথমত স্বল্পপরিচিত কাউকে ‘তুমি’ ডাক, তার উপর আগ বাড়িয়ে উপহার করতে চাওয়া তৌফিককে কথা মোটেও পছন্দ করলোনা। থমথমে মুখে খানিকটা শক্ত কন্ঠে বললো,
– নো থ্যাংকস মিষ্টার তৌফিক। আমি একাই চলে যেতে পারব।
এই বলে আর ভদ্রতার বালাই না করেই কথা গটগট পায়ে হাঁটা ধরল। তৌফিক আশাহত হয়ে চেয়ে রইল কথার গমন পানে। বিরবির করে বললো,
– যা বাবাহ, মিস অনন্যা তো আমাকে পাত্তাই দিচ্ছেন না। ব্যাপার না আজ নাহয় কাল আমি আপনার মন জয় করে নেবই মিস অনন্যা।
*
– মাম্মা?
– হ্যাঁ মা।
– আমরা কোতায় যাব?
– বাইরে মা।
– ঘুরুঘুরু করব আমরা?
কথা মেয়ের চুল বাঁধতে বাঁধতে মুচকি হেসে বলে,
– হ্যাঁ আমরা আজ ঘুরুঘুরু করতে যাব।
ঘুরাঘুরির কথা শুনে স্নিগ্ধতা আনন্দে আটখানা হয়ে গেল। কথা মেয়ের হাসিমুখ পরখ করে মুচকি হাসল। তার চড়ুই পাখিটা হাসলে ও না হেসে পারেনা।
– মাম্মা এতটু লিপিসটিক লাগিয়ে দাও।
কথা চুলে বিনুনি করতে করতে বলে,
– না মা। ওগুলো পঁচা জিনিস। এগুলো স্কিনের ক্ষতি করে।
স্নিগ্ধতাকে সাবধানী বাণী ছুঁড়ে কথা পাশের রুমে ঢুকলো। আলমারী থেকে নিজের পার্সটা নিয়ে আলমারী লক করে নিজের রুমে আসতেই ওর চক্ষু ছানাবড়া হয়ে গেল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে স্নিগ্ধতা কথার লিপস্টিকটা নিয়ে দুই ঠোঁটে সমানতালে ঘষছে। কথা আঁতকে উঠে লিপস্টিকটা ছিনিয়ে নেয় ওর হাত থেকে। স্নিগ্ধতার ছোট ঠোঁটদুটো লাল লিপস্টিকে একদম বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা। স্নিগ্ধতা ঠোঁট এলিয়ে হেসে বলে,
– মাম্মা আমাকে ছুন্দল লাগছেনা?
কথা কপাল চাপরে হতাশ নিঃশ্বাস ছাড়ে। এই ঢঙ্গীটাকে নিয়ে ও কোথায় যাবে? মেয়েকে কষে একটা ধমক লাগানোর অভিপ্রায় হলেও কথা নিজের রাগটা গিলে নিল। কারণ কথার ধমকের পর তার মেয়ে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদবে। যা কথার একটুও সহ্য হবেনা। ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কথা বাথরুম থেকে একটা ন্যাকড়া ভিজিয়ে এনে মেয়ের ঠোঁটের চারদিকের ছড়িয়ে থাকা লিপস্টিক মুছে দিল। ভুলেও ঠোঁটে হাত দিলনা। কারণ ঠোঁটের লিপস্টিক মুছতে গেলে এখন চিৎকারে দোতলার বাসাটা কেঁপে উঠবে।
বাসা থেকে বের হয়ে তালা লাগিয়ে পাশের ফ্ল্যাটের দরজা নক করে কথা। অনতিবিলম্বে ফারহা দরজা খুলে দেয়। কথাকে আপাদমস্তক পরখ করে ফারহা সহাস্যে বললো,
– মাশাল্লাহ কথারাণী তোকে তো খুব সুন্দর দেখতে লাগছে রে। একদম নীলকন্ঠ ফুলের মতো। কেন যে শাড়ি পড়তে চাস না তুই!
ফারহার কথায় আফসোস ঝরে পড়ল। কথা নিজের দিকে তাকাল। একটা গাঢ় নীল রঙা জামদানী শাড়ি ওর পরনে। সেইম ডিজাইনের কালো রঙের জামদানী ফারহার পরনে। আসলে এই শাড়ি দুটো ফারহা-ই অর্ডার করেছিল দুই বান্ধবীর জন্য। আজ অনেকদিন পর শাড়ি শরীরে শাড়ি জড়িয়ে কথার অদ্ভুত অনুভূতি হলো। মনে পড়ল অতীতের কথা। একসময় শাড়ির প্রতি ছিল তরুনী কথার প্রবল ঝোঁক। হুটহাট শাড়ি পড়ে তিড়িংবিরিং করা ছিল ওর নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। এই শাড়ি নামক বস্ত্রটার সাথে অতীতের কত মধুর স্মৃতি জমে আছে। কিন্তু সেই স্মৃতিগুলো এখন কেবল যন্ত্রণা দেয় কথাকে। তাইতো শাড়ি নামক অপ্রিয় বস্ত্রটাকে শরীরে জড়াতে বিতৃষ্ণা কাজ করে।
– কিরে কই হারালি।
কথা সপ্রতিভ হলো। বললো,
– তোর তৈরী হওয়া হয়েছে।
– হ্যাঁ হয়ে গিয়েছে। দাঁড়া পার্সটা নিয়ে আসি। ফাইয়াজ আসো তোমার কথা খালামনি আর স্নিগ্ধু এসে গিয়েছে।
ফাইয়াজকে দেখেই স্নিগ্ধতা আহ্লাদে আটখানা হয়ে গেল। পরনের ঝালরযুক্ত নীল ফ্রকটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখিয়ে বললো,
– ফাইয়াজ ভাইয়া দেখ দেখ আমি কত ছুন্দল জামা পরেছি।
– তোমাকে প্রিন্সেসের মতো লাগছে স্নিগ্ধু।
স্নিগ্ধতা লজ্জায় মুখ ঢেকে ফেললো। কথা আর ফারহা হু হা করে হেসে দিল ওদের কাণ্ডে। ফারহা কথার কানে কানে ফিসফিস করে বললো,
– আমি প্রস্তাবটা দিয়ে তাহলে ভুল করিনি। স্নিগ্ধতা তাহলে আমার বৌমা হচ্ছে।
.
– মামু আমরা কোথায় যাচ্ছি?
– ড্রিম ওয়াল্ডে বাবা।
– ওয়াও। অনেক মজা হবে তাহলে। মামু আমি বোটিং করব কিন্তু।
স্নিগ্ধ একহাতে ড্রাইভ করতে করতে মৃদু হেসে বললো,
– ঠিক আছে চ্যাম্প।
– তুমি তো সুইমিং পারোনা সায়ান। যদি পানিতে পড়ে যাও।
ফ্রন্ট সিটে স্নিগ্ধর পাশে বসা সিমরান বললো। সায়ান বেশ ভাব নিয়ে বললো,
– ডোন্ট ওরি মাম্মি। মামু আছেনা। আমি পানিতে পড়ে
গেলে মামু আমাকে সেইভ করে নেবে। বিকজ হি ইজ মাই সুপার হিরো।
লুকিং মিররে সায়ানের গর্বিত মুখটা দেখে স্নিগ্ধ ফিচেল হাসলো। এই বাচ্চাটার জন্য ও দুনিয়ার সব কিছু করতে রাজি। অতীতে যা ছাড়তে হয়েছে তা নিয়ে বিন্দুমাত্র আফসোস হয়না স্নিগ্ধর যখন এই নিষ্পাপ মুখটা চোখের সামনে দেখে । এই নিষ্পাপ বাচ্চাটা যে ওর প্রিয় বন্ধুর শেষ চিহ্ন, তার রেখে যাওয়া আমানত। যাকে মৃত্যুর আগে ওর হাতে তুলে দিয়ে গিয়েছিল মায়ান!
স্নিগ্ধর ব্ল্যাক টেসলা কারটা ব্রেক কষে একটা সাফারি পার্কের সামনে। গাড়ি থেকে সবার আগে লাফিয়ে নেমে পড়ে সায়ান। সিমরান ছেলেকে কড়া সাবধানী কন্ঠে বলে,
– সায়ান মামুর হাত ধরে রাখ। নাহলে ভীড়ের মধ্যে হারিয়ে যাবে।
পরপর গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়িয়ে চোখে সানগ্লাসটা পরে নেয়। পরনে একটা চকলেট কালারের ক্যাজুয়াল শার্ট আর ব্ল্যাক ডেনিম প্যান্ট। আপাদমস্তক এই সুদর্শন তাগড়া পুরুষটিকে কোন হিরোর চেয়ে কম লাগছেনা। স্নিগ্ধ টিকিট কেটে ওদের নিয়ে ভেতরে ঢোকে। সায়ান সবার আগে একটা প্লে কার রাইড করার বায়না ধরল। স্নিগ্ধ ভাগনের কথামতো একটা কার বুক করলো আধাঘন্টার জন্য। সিমরানকে রেস্টুরেন্ট এরিয়ায় রিল্যাক্স হতে বসতে বলে স্নিগ্ধ নিজেই সায়ানকে পাহারা দিতে দাঁড়ায়। স্নিগ্ধ ওয়েটিং এরিয়ায় দাঁড়িয়ে নিজের ফোনে নিমগ্ন ছিল। হঠাৎ একটা মেয়ে বাচ্চার তারস্বরে ক্রন্দন ধ্বনি ওর কানে এসে বাড়ি খায়। স্নিগ্ধ চমকে উঠে সামনে তাকায়। দেখে সায়ানের কারের বাড়ি খেয়ে একটা বাচ্চা মেয়ে নিজের কার থেকে অতর্কিতে পড়ে গিয়েছে। ফ্লোরে পড়ে বাচ্চাটা ঠোঁট ভেঙে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে। স্নিগ্ধ উদ্বিগ্ন চিত্তে বেঁড়ি টপকে ভেতরে ঢুকে যায়। ত্রস্ত বাচ্চাটাকে ফ্লোর থেকে তুলে নিজের বুকে জড়িয়ে নেয়। কিন্তু হঠাৎ কি হলো কে জানে,বাচ্চাটাকে বুকে নিতেই ওর হৃৎস্পন্দন থমকে যায়। অদ্ভুত অনুভূতিতে কেঁপে উঠে বুকটা। অন্তরের অদ্ভুত তাড়নায় স্নিগ্ধ মেয়েটাকে বুক থেকে তুলে। ওর কান্নাভেজা তুলতুলে মুখটা হাতের আজলায় নিতেই স্নিগ্ধ সম্পূর্ণ স্তম্ভিত হয়ে যায়। বাচ্চাদের মুখটায় যেন নিজের অতি পরিচিত কারো স্পষ্ট ছায়া দেখল স্নিগ্ধ। কিন্তু আদতে কে মস্তিষ্কে ক্যাচ করতে পারলনা। শুধু অনুভব করলো মাখনের মতো নরম শরীরটা ওর পরম আপন আপন অনুভব হচ্ছে!
চলমান…..
[ আসসালামু আলাইকুম পাঠক। গল্পটা কি চলমান রাখব নাকি বন্ধ করে দেব? আপনাদের যথাযথ রেসপন্স দেখতে পাচ্ছিনা। কমেন্টেও নাইস,নেক্সট, সুন্দর হয়েছে এমন কমেন্ট। আমি এটা হয়তো বন্ধ করে দেব আপনাদের যথার্থ রেসপন্স না পেলে। সাত-আটঘন্টা সময় লাগিয়ে এত কষ্ট করে লাভ আছে, যদি গল্পে রেসপন্সই না পাই।🤧]