#যদি_আবার_ভালোবাসো ৫
#লেখনীতে_আইরা_নূর
‼️কার্টেসি ব্যতীত কপি করা নিষিদ্ধ‼️
সায়ের এতো জোরে মেয়েটার গলা টি”পে ধরেছে যে সাইনার চোখ মুখ উল্টে যাচ্ছে। সাইনা বার বার তার সামনে আকুতি মিনতি করছে। কিন্তু সায়েরের কানে যেনো মেয়েটার কোনো কথাই যাচ্ছে না।
হঠাৎই সায়েরের খেয়াল হয় যে সাইনার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। তাই সায়ের দ্রুত সাইনার কাছ থেকে সরে আসে আর তার উদ্দেশ্যে বলে,
সায়ের:- আমার চোখের সামনে থেকে এক্ষণই চলে যাও। নাহলে যে আমি তোমার কি হাল করবো তা আমি নিজেও জানি না। (রাগী কন্ঠে)
সাইনা ও আর একমুহুর্ত সেখানে দাঁড়ায় না। সে তারাতারি করে সায়েরের চোখের আড়ালে চলে যায়। সায়েরের ফ্ল্যাটে 3 টা বেডরুম, একটা বড় হলরূম, কিচেন এবং একটা স্টোররুমে আছে। সাইনা দ্রুত একটা বেড রুমে ঢুকে পড়ে আর দরজা বন্ধ করে দরজার সাথে হেলান দিয়ে নিচে বসে পড়ে।
সাইনা, সায়ের কে এর আগে কখনো এমন রূপে দেখেনি। কারণ সায়ের কখনোই তার সামনে নিজের রাগ প্রকাশ করতো না। আর আজকে সায়েরের এই রাগী চেহারা দেখে বেচারি অনেক ভয় পেয়ে গিয়েছে। তাই তো কোনো দিকে না তাকিয়ে সোজা রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে সে।
সাইনার শরীরের ব্যা’থা গুলো আবারো চাড়া দিয়ে উঠেছে। কপাল আর হাতের কা”টা জায়গা গুলো দিয়ে চুয়ে চুয়ে র’ক্ত পড়ছে বেচারীর। সাইনা নিজের শাড়ির আঁচল দিয়ে একবার হাতের র’ক্ত মুছছে তো একবার কপালের র’ক্ত মুছছে।
এর মধ্যেই হঠাৎ করে সাইনার প্রচণ্ড মাথা ব্য’থা শুরু হয়ে যায়। সাইনা তার মাথা দুই হাত দিয়ে চে’পে ধরে ছটফট করতে শুরু করে। এবার তার ব্যা’থা টা একটু বেশিই হচ্ছে। একেই তো ৬.৩০ ঘণ্টা জার্নি করে এসেছে তার উপর আবার এত কিছু হয়ে গেছে। কপালের র’ক্ত পড়া ও এখনো বন্ধ হচ্ছে না।
কপালের আ’ঘা’তে’র জন্যই হয়তো মাথায় প্রচণ্ড ব্যা’থা করছে এখন। হঠাৎ করেই সাইনার মনে হচ্ছে নাক দিয়ে তরল জাতীয় কিছু বের হচ্ছে। নাকে হাত রাখতেই সাইনা বুঝতে পারে যে তার আবারো নোজ ব্লি’ডিং হচ্ছে। সাইনা দ্রুত উঠে ওয়াশরুমে গিয়ে পানি দিয়ে র’ক্ত’টা পরিষ্কার করে ফেলে। মুখে কয়েক বার পানির ঝটা দিয়ে ভালো করে মুখ ধুয়ে নেয়।
মাথা ব্য’থা’য় ঠিক মতো হাঁটতে পর্যন্ত পারছে না বেচারি। তাও কষ্ট করে দেওয়াল ধরে ধরে রুমে এসে ফার্স্ট এইড বক্সটা খুঁজতে শুরু করে সাইনা। ফার্স্ট এইড বক্স টা ভ্যানিটির উপর ছিল। সাইনা বক্সটা নিয়ে বেডের উপর বসে এরপর একটা পেইন কিলার খেয়ে নেয়। এরপর এন্টিসেপটিক দিয়ে কা’টা জায়গা গুলো ভালো করে পরিষ্কার করে অয়েন্টমেন্ট লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করে নেয়।
সাইনার শরীরটা ও এখন খুব খারাপ লাগছে। আর শরীরের দোষ দিয়েই বা কি লাভ। কালকে থেকে কিছুই খাইনি মেয়েটা। মাহবুব রহমান কে বিয়ে না করতে চাওয়ায় তার ফুপি তাকে কিচ্ছু খেতে দেয় নি সারাটা দিন। এমন কি পানি টা ও পর্যন্ত মুখে তুলতে দেন নি তিনি। আজকে শুধু একটু পানি ই খেয়েছে সেটাও আবার সায়েরের অগোচরে।
সাইনার মাথা ব্যা’থা এখনো কমেনি বরং আরো বেড়েই চলেছে। অবশ্য সাইনা ভালো করেই জানে হাই ডোজের ঔষুধ ছাড়া তার এই মাথা ব্য’থা এতো সহজে যাবে না। তাই সাইনা আর কিছু না ভেবেই বেডে গিয়ে শুয়ে পড়ে। একটু ঘুমালে যদি ব্য’থা টা ঠিক হয়। বেশ কিছুক্ষণ পর দরজায় টোকা পড়ার আওয়াজে সাইনা উঠে পড়ে। কেবলই দুচোখ জুড়ে তার ঘুমটা এসেছিলো। সাইনা ধীরে ধীরে বেড থেকে নেমে দরজাটা খুলে দেয়।
দরজা খুলতেই সায়ের বাজ খাই কন্ঠে বলে উঠে,
সায়ের:- তুমি এখানে কি করছ? আর দরজা খুলতে এতো সময় লাগে?
সায়েরের এমন আচরণে সাইনা খানিকটা ভয় পেলে ও নিজেকে সামলিয়ে বলে উঠে,
সাইনা:- তুমিই তো বলেছিলে যে তোমার সামনে থেকে যেনো আমি চলে যায় তাই আমি তখন তোমার রাগের হাত থেকে বাঁচতে এই রুমে এসে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলাম।
সায়ের:- রূম থেকে এক্ষণই বের হয়ে যাও। এটা আমার রুম এই রুমে আমি থাকি পাশের রুমে যাও। আপাতত ঐ রুমেই তুমি থাকবে।
সাইনা কিছু না বলে চুপচাপ ঐ রূম থেকে বের হয়ে আসে। তখনই পিছন থেকে সায়ের বলে উঠে,
সায়ের:- আর শোনো ঐ রুমে কাবার্ডে কিছু কাপড় রাখা আছে এইসব শাড়ি টাড়ি চেঞ্জ করে ঐ গুলো পরে নিও।
বলেই সায়ের রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয় সাইনার মুখের উপরই। সাইয়া বেশ কিছুক্ষণ বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে। এরপর একটা বুক ভরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চলে যায় পাশের রুমে।
,,,,,,
সূর্যের নরম আলো পর্দার ফাঁক গলিয়ে চোখে পড়তেই সাইনার ঘুমটা হালকা হয়ে আসে। সাইনা পিট পিট করে চোখ মেলে তাকাই। আশপাশ টা ঠাওর করতেই বুঝতে পারে যে সে এখন সায়েরের ফ্ল্যাটে আছে। সাইনা ঘুম ঘুম কন্ঠে বলে,
সাইনা:- ও সকাল হয়ে গিয়েছে। নির তো মনে হয় এখনো ঘুম থেকে ওঠেনি। আমি এক কাজ করি ব্রেকফাস্ট টা বানিয়ে ফেলি।
যেই ভাবা সেই কাজ সাইনা দ্রুত ওয়াশরুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে নেয়। এরপর তাড়াতাড়ি করে সায়ের আর তার জন্য ব্রেকফাস্ট বানাই। সব কটা ই সায়েরের পছন্দের খাবার। রান্না শেষে সাইনা খুব সুন্দর করে খাবার গুলো সাজিয়ে রাখে টেবিলে। ঘড়ির দিকে তাকাতেই দেখতে পাই সকাল ৮ টা বাজছে। সাইনা বিড়বিড় করে বলে উঠে,
সাইনা:- এখন ওকে গিয়ে ডাকি কাল থেকে হয়তো বেচারা কিছুই খাইনি।
এইদিকে যে সে কিছু খাইনি সেটা বেমালুম সাইনা ভুলে গিয়েছে। সাইনা চলে যায় সায়ের কে ডাকতে তার রুমের সামনে। দুইবার দরজায় টোকা দিয়ে সায়েরের কোনো সাড়া শব্দ পাইনা সে। তাই এবার একটু জোরে জোরে সায়ের কে ডাকতে শুরু করে।
সাইনা:- নির, নির তুমি কি এখনো ঘুম থেকে ওঠনি..?? আমি ব্রেকফাস্ট রেডি করেছি তুমি খাবে না..?? কালকে রাতে ও তো কিছু খেলে না। নির আমার কথা শুনতে পাচ্ছ তুমি.??? এসো তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও। অনেকটা বেলা হয়ে গিয়েছে তো।
সাইনার, সায়ের কে নির বলে ডাকাই হঠাৎ করে সায়েরের রুমের দরজা টা খুলে যায় আর সায়ের, সাইনা কে টেনে ভেতরে নিয়ে এসে তার গালে সজোরে একটা থা’প্প’ড় বসিয়ে দেয়। সাইয়া তো পুরাই হতবাক।
সাইনা এখনও বুঝতে পারছে না যে সে কি এমন ভুল করলো যার জন্য সায়ের তাকে থা’প্প’ড় মা’র’লো। সায়ের এবার সাইনার গাল দুইটা খুব শক্ত করে চে’পে ধরে আর দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
সায়ের:- এই মেয়ে তোর সাহস হয় কিভাবে যে তুই আমাকে বার বার নির বলে ডাকিস। তুই জানিস না এই নামে শুধুমাত্র আমার কাছের মানুষ ছাড়া বাইরের কেউ ডাকতে পারে না আর তুই আমার কেউ না। তুই আমাকে এই নামে আর কখনও ডাকবি না। কালকে থেকে তোকে সহ্য করছি। যখনই পারছিস আমাকে নির বলে ডাকছিস। তোর মতো মেয়েকে আমি একদিন নিজের কাছের মানুষ ভেবেছিলাম তাই এই নামে ডাকতে বলেছিলাম। কিন্তু পরবর্তী সময়ে যদি আমি তোর মুখে এই নাম শুনি তাহলে….
সাইনা নিজের জলে টইটম্বুর চোখ নিয়ে সায়ের দিকে তাকাই আর একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে করুন স্বরে বলে,
সাইনা:- আর ডাকব না। হ্যাঁ, আর কোনো দিনও ডাকব না তোমায় নির বলে। শুধুমাত্র সেইদিনই ডাকব যেই দিন তোমার সাথে আমার শেষ দেখা হবে। এর আগে তুমি চাইলেও আর আমার মুখ থেকে এই নাম টা বের করাতে পারবে না।
বলেই সাইনা আর এক মুহূর্ত ও সেখানে না দাঁড়িয়ে নিচ থেকে উঠে রূম থেকে বের হয়ে যাই। সায়ের এখনো স্তব্ধ হয়ে তার আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। তার সাইনার বলা শেষ কথাটা শুনে হঠাৎ করেই বুকের ভিতরটা ধুক করে উঠে।
সায়েরের হঠাৎ করেই কিছু একটা হারানোর ভয় হতে শুরু করে। সায়ের নিজের মাথা থেকে এইসব চিন্তা বাদ দিয়ে ফ্রেশ হয়ে রূম থেকে বের হয়। সায়ের খাবার টেবিলের কাছে এসে দেখে যে সাইনা ওড়না দিয়ে চোখের পানি মুছছে আর প্লেটে সায়েরের খাবার বেড়ে দিচ্ছি।
সাইনার চোখের পানি যেনো বাঁধ মানছে না। যত বারই সে চোখ মুছছে তত বারই নতুন দমে তার চোখ দুইটা ভিজে উঠছে। হঠাৎই সাইনার চোখ পড়ে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা সায়েরের দিকে। সাইনা শেষ বারের মতো চোখের পানি মুছে মুখে সেই চিরো চেনা হাসি ফুটিয়ে সায়েরের উদ্দেশ্যে বলে,
সাইনা:- ওহ তুমি এসে গেছো বসো। আমি খাবার বেড়ে দিয়েছি, তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও। কালকে তো কিছুই খাওনি। ক্ষিদে পেয়েছে বোধ হয় তোমার।
সাইনা অনেক ফর্সা হওয়ার গালে সায়েরের পাঁচ আঙ্গুলের দাগ স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে। গলাটা ও পুরা লাল হয়ে আছে। কালকে রাতে যেভাবে মেয়েটার গলা চেপে ধরেছিল। তাতে ম’রে যায়নি সেটাই অনেক।
সায়েরের হুস ফেরে কানে কলিংবেলের আওয়াজ ভেসে আসতে। সাইনা দরজা খুলতেই যাচ্ছিল তবে সায়ের তাকে আটকে নিজে গিয়ে দরজাটা খুলে দেয়। সাইনা ও সায়েরের পিছন পিছন যায় দেখার জন্য যে কে এসেছে আর গিয়ে সাইনা যা দেখে তা দেখে সে যেনো নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছে না।
~চলবে~