গল্প: চলো না আজ এ রুপকথা তোমাকে শোনাই (১৭)

পর্বসংখ্যা:১৭

লেখনীতে:প্রিয়াংশি চৌধুরী

দুপুর গড়িয়ে পড়তেই খানবাড়িতে ধীরে ধীরে জমে উঠলো কায়রাভের ছেলেপুলেদের দলের ভিড়।আট–দশজনের মতো হবে। হাসি, কথাবার্তা, কোলাহলে বাড়িটা হঠাৎ করেই প্রাণ ফিরে পেয়েছে। ড্রয়িংরুমে কায়রাভ কায়ানকে কোলে নিয়ে বসে আছে। পাশে সবুজ আর ফিরোজ। গল্পের ফাঁকে ফাঁকে কায়ানের আধো আধো বুলিতে পরিবেশটা আরও নরম হয়ে উঠেছে। আজ কায়ানকে বাগে পেয়ে ফিরোজ আর সবুজ প্রায় চটকে দিচ্ছে। এই গোলুমোলু বাচ্চাটাকে কি আদর না করে থাকা যায়! কায়ানকে ইতিমধ্যে লাল করে ফেলেছে সবাই। ড্রয়িংরুমের দরজায় এসে কায়েশী সবার দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে জানালো সবাইকে টেবিলে আসতে।

এক এক করে সবাই এসে বসে পড়লো। টেবিলের মাঝখানে কায়েশী যত্ন করে সাজিয়ে দিলো রান্না করা সমস্ত পদগুলো। বাসমতি পোলাওয়ের সুগন্ধে ম-ম করছে চারদিক। সব মিলিয়ে আজকের দুপুরটা উৎসবের মতো লাগছে। কায়রাও নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে কায়েশীর পাশে দাঁড়িয়ে পরিবেশনে হাত লাগালো। ফিরোজের প্লেটে পোলাও দিতে দিতে কায়রা হেসে জিজ্ঞেস করে,
“কেমন আছেন, ফিরোজ ভাইয়া? দিনকাল ভালো তো?”

ফিরোজ মৃদু হাসি হেসে বলল,
“ভালোই আছি, বোনু। এতো পোলাও দিও না, অল্প দাও।”

কায়রা বিস্ময়ের ভান করে চোখ বড় করলো,
“আরেহ! এইটুকুতে হবে নাকি? সারাদিন তো দৌড়ঝাঁপের ওপর থাকেন। আজ অন্তত কিছুতে মানা করবেন না।”

এই বলেই একটু বেশিই পোলাও তুলে দিলো ফিরোজের পাতে। ফিরোজ নিজেও আর কিছু বলল না। মনে মনে ঠিক করলো, আজ নাহয় সবটা খেয়েই যাবে। সবাইকে পরিবেশন শেষে কায়েশী বলল,
“কিছু লাগলে জানাবেন।”

এদিকে কায়রা কায়রাভের দিকে ফিরে বলল,
“ভাইজান, ফুপি আসতে পারবে না। তার নাকি শরীরটা একটু খারাপ।”

কায়রাভ মাথা নেড়ে বলল,
“হ্যাঁ, শুনলাম। আমাকেও ফোন করে জানিয়েছে।”

সবুজ তখন কায়রাভকে বলল,
“ভাই, আপনেও বসেন।”

কায়রাভ হালকা হেসে বলল,
“না রে, তোরা খা। আমি সকালে খেতে লেট করেছি। খিদেই পায় নি ভালো করে। তাছাড়া কাবির আসবে একটু পর। ওর সাথেই খাবো আজ। ”

কায়রা এবার কায়েশীর দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল,
“ভাবী, তুমি ঘরে চলে যাও। সকাল থেকে একাই খেটেছো। আমাকে তো কিছু করতে দিলে না। ভাইয়াদের কিছু লাগলে আমি দিয়ে দিবো। তুমি রেস্ট নাও গিয়ে।”

কায়েশী আর কথা বাড়ালো না। মাথা নেড়ে কায়রাভের থেকে কায়ানকে কোলে তুলে নিলো। কায়ানের খাওয়ার সময় হয়ে গেছে। তাই রান্নাঘর থেকে সুজির বাটি নিয়ে সে ঘরের দিকে চলে গেলো। ঘরে এসে কায়ানকে বিছানায় বসিয়ে খেলনা হাতে দিলো। স্পোর্টস কারটা হাতে নিয়েই কায়ান মগ্ন হয়ে গেলো খেলায়। কায়েশী চুলগুলো পেচিয়ে হাতখোপা করতে করতে বলল,
“আমি চেঞ্জ করে আসছি। আমি না আসা পর্যন্ত চুপটি করে এখানে বসে থাকবে, ঠিক আছে? কোথাও যেও না।”

কায়ান মায়ের কথায় মাথা নেড়ে আবার খেলায় মন দিলো। একেবারে গোসল সেরে কায়েশী বেরিয়ে এলো বাথরুম থেকে। কমলা রঙের শাড়িটা ওর ধবধবে ফর্সা গায়ে আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। তোয়ালে দিয়ে ভেজা চুল মুছতে মুছতে বিছানার দিকে তাকিয়ে দেখে কায়ান ঠিক আগের জায়গাতেই বসে আছে। একটা তৃপ্তির হাসি ঠোঁটে ফুটে উঠলো কায়েশীর মুখে। কায়ানের ফুলো ফুলো গালে দুটো চু’মু খেয়ে বলল,
“খিদে পেয়েছে? হু?”

কায়ান মাথা নাড়ালো আর বলল,
“হুম, কিন্তু ভাতু কাবো না। ”

“ভাতের সাথে তোমার কিসের এত শত্রুতা বুঝি না। ভাত না খেলে সারাজীবন ওইটুকুনি হাঁসের বাচ্চার মতো থাকবে! বড় আর হবে না। ”

কায়ান ফিক করে ফোকলা দাঁতে হেসে বলে,
“হিহিহি, হাসেল বাচ্চা, প্যাক প্যাক! আমি চিনি। ”

“হাঁসের বাচ্চা চেনো? কে চেনালো?”

“চাচু দেকিয়েচে! আমাকে পুকুলে নিয়ে গেচিলো। ”

কায়েশী প্রথমে একটু অবাক হলো। পরক্ষনেই মনে পরে ও ছাড়া এসব উল্টোপাল্টা কাজ আর কে করবে! তারপর কায়েশী সুজির বাটি নিয়ে বিছানায় বসে ধীরে ধীরে চামচে করে কায়ানকে সুজি খাওয়াতে লাগলো। খাওয়া শেষ হলে তাকে কোলে নিয়ে বারান্দায় একটু হাঁটাহাঁটি করলো। অল্প সময়েই কায়ানের চোখ দুটো ভারী হয়ে এলো। ঘুম পাড়িয়ে তাকে বিছানায় শুইয়ে দিলো কায়েশী। কায়েশী নিজেও পাশে শুয়ে পড়লো।  কায়ানের মাথায় আলতো করে হাত বুলাতে বুলাতে হঠাৎ চোখ আটকে গেল ওর থুতনিতে। থুতনির মাঝখানে কাটা। একদম হুবহু কায়রাভের মতো। চোখ দুটোও পেয়েছে কায়রাভের মতো। তাহলে কি ছেলেটা কায়রাভের মতোই হয়েছে?

কায়েশী আগে কেন খেয়াল করেনি? আসলে খেয়াল করবে কীভাবে, মনটাই তো সারাদিন উদাসীনতায় ঢাকা থাকতো। কোনো কিছুর উপর আগ্রহ দেখাতো না। এখনও মাঝে মাঝে কিছু জিনিস লক্ষ্য করে কায়েশী অবাক হয়। যে কেন এতদিন খেয়াল হয়নি তার। কায়ানের নিস্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে বুকের ভেতর আচমকাই হু হু করে উঠলো মায়ায়। কী অমূল্য তার এই নারীছেড়া ধন। অথচ জন্মের পর প্রথম কটা মাস কতই না নির্মমভাবে অবহেলা করেছে সে! শুধু কায়রাভের প্রতি ক্ষোভের কারণে ছুঁয়েও দেখেনি নিজের সন্তানকে। তখন সে ছিল এক পাষাণ নারী, এক পাষান মা। মানসিক আঘাতে জর্জরিত ছিলো বলে কোনোকিছুই সহ্য হতো না। সেই বিষাক্ত দিনগুলো কায়েশী কোনোদিন ভুলতে পারবে না, আর না সেইসব কাজের জন্য নিজেকে কোনোদিন পুরোপুরি ক্ষমা করতে পারবে। ভাবনার স্রোতের মাঝেই কায়েশীর চোখের পাতা ভারী হয়ে এলো। ক্লান্ত দুচোখ বুজে এলো ধীরে ধীরে। কায়ানের নিঃশ্বাসের তালে তালে কায়েশীও ঘুমের অতলে হারিয়ে গেলো। অপরাধবোধ, মায়া আর নিঃশব্দ ভালোবাসার আবেশে।

—————————————————-

ঘরে পা দিয়েই কায়রাভ থমকে গেলো। ঘরে এসেছিলো কায়েশীকে খেতে ডাকতে। এসে দেখে বিছানায় মা আর ছেলে দুজনেই গভীর ঘুমে। নিঃশব্দে কাছে এগিয়ে এসে একটু উঁকি দিলো কায়েশীর মুখপানে। ঘুমে ঢলে পড়া ক্লান্ত মুখটা দেখে মুহূর্তের জন্য মন চাইলো না তাকে জাগাতে। কিন্তু না জাগালেও তো চলবে না। মেয়েটা দুপুরে কিছুই খায়নি। সকালেও সামান্য খেয়ে রান্নার কাজে লেগে পড়েছিলো। ঘড়িতে তাকিয়ে দেখলো, চারটা বাজতে আর বেশি দেরি নেই। খুব আস্তে, নরম সুরে ডাকলো কায়রাভ,
“কায়েশী… ওঠো। বিকেল হয়ে এলো। খাবে কখন?”

একবার-দু’বার ডাকার পর ঘুমের গভীরতা আলগা হলো তার। চোখ পিটপিট করে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই চোখে পড়লো কায়রাভকে। পাশে শুয়ে থাকা কায়ানকে সাবধানে নিজের থেকে আলাদা করে ধীরে উঠে বসলো সে। ঘুম জড়ানো কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“ডাকছেন কেন? কী হয়েছে?”

কায়রাভ শান্ত স্বরে বললো,
“খাবে না? আমি আর কায়রা তোমার জন্য বসে আছি।”

কায়েশীর কপালে হালকা ভাঁজ পড়ে।
“আপনারা খেয়ে নিতেন। শুধু শুধু অপেক্ষা করলেন কেন?”

কায়রাভের দৃঢ় স্বরে বলে,
“কথা বাড়িও না। ওঠো এখন। খুব তাড়া না থাকলে তোমাকে ছাড়া আমি কবে খেয়েছি?”

কায়েশী আর কিছু বললো না। শাড়ি ঠিক করে নীরবে উঠে দাঁড়ালো। কায়রাভের পিছু পিছু সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে নামতে মনে হলো এই অপেক্ষাটুকুই অজান্তেই তাদের সম্পর্কের অনবদ্য অবয়ব। নিচে নেমে কায়েশী কায়রার দিকে তাকিয়ে বললো,
“তোমরা বসে পড়ো। আমি রান্নাঘরে গিয়ে জগটা ভরে নিয়ে আসছি। পানি শেষ। ”

কথাগুলো বলেই সে ধীরে পা বাড়ালো রান্নাঘরের দিকে। হঠাৎই নীরব পরিবেশ ভারী হয়ে উঠে ভারিক্কি পুরুষালী কন্ঠের ডাকে,

“ভাবী! ও ভাবী’ই’ই! ভাবীজা’ন!! ”

খান বাড়ির দোরগোড়ায় পা রেখেই চেঁচামেচি শুরু করেছে কাবির। যেন আগুন লেগেছে কোথাও এমন ভাবে চেঁচাচ্ছে। সেই হাকডাকে কায়েশীর কানের পর্দা প্রায় ফেটে যাওয়ার জোগাড়। বিরক্তির চূড়ান্তে পৌঁছে সে কানে হাত চেপে রান্নাঘরের বাইরে বেরিয়ে এলো। ধমকে উঠে কায়েশী জিজ্ঞেস করে,
“কী হয়েছেটা কি? এভাবে ষাঁ*ড়ের মতো চেঁচিয়ে মাথা খাচ্ছো কেন? ”

কাবির ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি খেলিয়ে মেকি সুরে বলল,
“আমারে ষাঁ*ড় কইলেন ক্যান ভাবী? আমি কি কোনোদিন শিং দিয়া গুঁ*তা দিছি আপনারে? আমার মতো মাসুম’রে আপনি ষা*ড় তকমা কিভাবে দিলেন! হা’উ!!”

কায়েশী বিরক্তিতে লম্বা একটা শ্বাস ফেলে।
“বাজে কথা বন্ধ করো। কী দরকার ছিলো, সেটা বলো। ডাকছিলে কেন এভাবে? ”

কায়েশীর জবাবে কাবির হাত-পা উঁচিয়ে বিশাল এক হাই তুললো। মনে হচ্ছে পৃথিবীর সমস্ত ক্লান্তি একাই বহন করে এসেছে সে। তারপর হেলেদুলে আরাম করে সোফায় বসে নরম গলায় আদেশ ছুড়ে দিলো,
“ক’ড়া’হ করে এক কাপ চা বানায়া আনেন তো,   ভাবীজান। চিনি দুই চামচ। ”

কায়েশী কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। মানেটা কি? শুধুমাত্র এক কাপ চায়ের জন্য এত কাণ্ড! এত চেঁচামেচি! কায়েশী মুহূর্তেই ধরে ফেলল এটা নিছক চায়ের আবদার নয়, এটা কাবিরের বদমায়েশী, তাকে জ্বালানোর ফন্দি! শোধ নিচ্ছে মনে হয়। সব বুঝেও কিছু না বলে কায়েশী রাগ চেপে ধুপধাপ পা ফেলে রান্নাঘরের দিকে চলে যায়। আর পেছনে বসে থাকা কাবির মিটিমিটি হাসলো, আজকের মতো ভাবীকে জ্বালানোর মিশন সফল হয়েছে ভেবে।

এদিকে কায়রা ফিক করে হেসে উঠলো কাবিরের এমন কান্ডে। চোখে দুষ্টুমির ঝিলিক।
“কী ব্যাপার, ভাইজান? হঠাৎ ভাবীর পেছনে লাগলে কেন?”

কাবির অনায়াস ভঙ্গিতে বলল,
“ভাবীর পেছনে লাগমু না তো কার পেছনে লাগমু ক? দশটা না, পাঁচটা না আমাগো একটা মাত্র সুইট কিউট ভাবী!”

কায়রা আবারও হেসে ফেললো।
“সুইট কিউট! হাহ!”

ঠিক তখনই পেছন থেকে কায়রাভের গলা ভেসে এলো,
“কিরে! ওকে ক্ষ্যাপালি কেন? মহারানী, আজ ভালো মুডে ছিলো।”

কাবির ভ্রু কুঁচকে তাকালো,
“কেন? ভাবী কি তোমাগো উপর চোটপাট করে নাকি, যে ওনার মুড বুইঝা চলতে হবো? ”

কায়রাভ এগিয়ে এসে কাবিরের বাহুতে আলতো চাপড় মেরে বলল,
“চুপ কর ব্যাটা! বাড়িতে ঢুকেই ঝড় তুলে দিলি। আবার ঝগড়া লাগাতে চাস নাকি?”

কাবির হালকা হেসে নিলো। অনেকদিন পর তিন ভাইবোন একসঙ্গে। এই মুহূর্তে ঝগড়ারও যেন আলাদা মাধুর্য। তবে কায়রার মাথায় তখন অন্য হিসেব। এটাই মোক্ষম সুযোগ অনুমতি নেওয়ার। নরম সুরে সে বলল,
“এই যে আমার দুই ভাইজানেরা… একটা আর্জি ছিল।”

কাবির এক ভ্রু উঁচু করে বলল,
“কি আর্জি? কইয়া ফালা?”

কায়রাভও তাকালো,
“বল, কী বলবি? ”

কায়রা একটু ইতস্তত করে বলল,
” আসলে হয়েছে কি, আমাদের ভার্সিটি থেকে ট্যুরে যাবে। বন্ধুরাও সবাই যাচ্ছে। তো… আমি ভাবছিলাম আমিও যাবো। এখন তোমরা কি বলো? ”

দু’ভাই একসাথে একে অপরের দিকে তাকালো। চোখে চোখে নিরব বার্তা আদান-প্রদান হলো। কায়রা তা বুঝতে না পেরে নার্ভাসনেসে দাঁত দিয়ে নখ কামড়াচ্ছিলো। আর বোঝার চেষ্টা করছিলো দুই ভাইয়ের ভাবনা। কাবির প্রশ্ন করলো,
“কই যাবো? মানে জায়গার নাম কী?”

কায়রা মিনমিনিয়ে বলল,
“সিলেট। একদিনেরই…ট্যুর।”

কায়রাভ সঙ্গে সঙ্গে বলল,
“এত দূরে একা পাঠানো যাবে না। কাছাকাছি জায়গায় হলে ভেবে দেখতাম।”

কায়রা অসহায় চোখে কাবিরের দিকে তাকালো। কায়রা জানে একমাত্র তার ছোট ভাইজানই পারে তাকে পুরোপুরি বুঝতে। কাবির বুঝলো বোনের মনোভাব। যদিও কাবির নিজেও বোনকে দূরে পাঠিয়ে শান্তি পাবে না তবে বোনের আবদারটাও ফেলতে পারছে না। কাবির একটু ভেবে নিয়ে বলল,
“ভাইজান, একদিনেরই তো ব্যাপার। যাইতে দেও। এমনিতেও ও তো কখনো বাইরে যাওয়ার জন্য বায়না ধরে না।”

কায়রার চোখ দুটো আনন্দে ঝিলমিল করে উঠলো। কায়রাভ একটু ভাবলো। তারপর এক নিঃশ্বাসে বলল,
“আচ্ছা, যাক। তবে ঘন্টায় ঘন্টায় আপডেট চাই।”

কায়রা উচ্ছ্বাস চাপতে না পেরে হুরমুর করে বলল,
“ওকে! ওকে! দু’জনকেই যথাসময়ে আপডেট দিবো।”

কায়রাভ গিয়ে টেবিলে বসলো। কায়রা কাবিরের পাশে গিয়ে আস্তে বলল,
“থ্যাংক ইউ, ভাইজান। নেক্সট টাইম আমিও তোমাকে হেল্প করবো।”

কাবির আবার ভ্রু উঁচিয়ে তাকালো,
“কোন বিষয়ে?”

কায়রা চোখ টিপে বলল,
“আমার হবু ভাবীর ব্যাপারে?”

কাবির পাত্তা না দিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলল,
“সর! সিংহরে ইদুঁর হেল্প করবো কইতাছে! তোর হেল্প চাইছে কে? কাবির কারও হেল্প নেয় না। আই ডোন্ট নিড এনিওয়ান ফর মাইসেলফ।”

কায়রা মুখ ভেংচিয়ে বলল,
” হু হু… দেখা যাবে। সুযোগ পেয়ে এটিটিউড নিচ্ছে! ”

কাবির এদিক ওদিক তাকিয়ে কাওকে খুঁজছিলো। বলল,
“আমার মুরগির বাচ্চা কই? ওরে দেকতাছি না যে?”

কায়রা টেবিলে বসতে বসতে বলে,
“তোমার মুরগির বাচ্চা মেইবি ঘুমে।”

ততক্ষণে কায়েশী হাতে চায়ের কাপ নিয়ে এসে হাজির। কাবিরের সামনে কাপটা বাড়িয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“এখন চা খেলে এত কিছু যে রান্না করলাম, সেসব খাবে কখন?”

কাবির চায়ে আলতো চুমুক দিয়ে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে জবাব দিলো,
“মাথাটা একটু ধরছিলো। আর তাছাড়া চা খাইলে তো আর পেট ভরে না। পেটে বহুত জায়গা আছে। কিন্তু মাথাটা আগে ঠান্ডা করা দরকার।”

কায়েশী আর কিছু বলল না। চুপচাপ সরে গেলো। টেবিলে গিয়ে কায়রাভ আর কায়রা খাবার বেড়ে দেওয়ার পর কাবিরের সামনেও প্লেট সাজিয়ে রাখলো। কায়রাভ তখন লক্ষ করলো, কায়েশীর সামনে কোনো প্লেট নেই। খাবারও বাড়েনি। সে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“তোমার খাবার কোথায়? নিজেরটা বাড়লে না যে!”

কায়েশী শান্ত গলায় বলল,
“আমি এসব খাব না। অত্যাধিক তেল-মশলা দেওয়া খাবার।”

ঠিক তখনই কাবির টেবিলে বসতে বসতে ঠাট্টার সুরে বলে উঠলো,
“ভাবী কি ডায়েট করেন নাকি? এমনিতেই যে হালকা শরীর, এই শরীরে ডায়েট করলে তো এক ফুঁ দিলেই উইড়া যাবেন!”

এই কথা বলে হু হু করে হেসে উঠলো কাবির। তার সঙ্গে কায়রাও। কায়েশীর চোখে মুহূর্তেই বিরক্তির ছায়া নামলো। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“তোমাকে কে বলেছে আমি ডায়েট করছি?এতো বেশি বুঝো কেন! সকালে তেলের পরোটা খেয়েছিলাম, যার জন্য এখনো গলা জ্বলছে। তাছাড়া আলাদা করে নিজের জন্য কিছু রান্না করিনি।”

কায়রাভ অবাক হয়ে বলল,
“তাহলে খাবে কী?”

“সুজি।”
কায়েশীর জবাবটা সংক্ষিপ্ত। কায়রাভের পাতে মাছের তরকারি বেড়ে দিতে দিতে বলে,
“কায়ানের জন্য বানানোর সময় একটু বেশি করেই বানিয়েছিলাম। ওটাই খাবো। ”

এই কথা শুনে কায়রাভ, কায়রা আর কাবির
তিনজনই উচ্চস্বরে হেসে উঠলো। কায়েশী এক মুহূর্তে থমকে গেলো। হাসার কারণটা বুঝতে না পেরে সবার সামনে অস্বস্তিতে পড়লো সে। খানিকটা রাগ চেপে রেখে বলল,
” হাসার কি আছে? এমন কী বললাম?”

কায়রাভ মেকি চিন্তামগ্ন কণ্ঠে বলল,
” কি বাচ্চা মেয়েকে বিয়ে করেছিলাম! এখনো সুজি খায়?”

কায়রা হেসেই বলল,
“সিরিয়াসলি ভাবি, তুমি সুজি খাবে? খেতে পারবে?”

কায়েশীর কণ্ঠে এবার দৃঢ়তা,
“তোমরা সুজিকে নিয়ে এতো অহেতুক ঠাট্টা করছো কেন আমি বুঝলাম না। জীবনে খেয়ে দেখোনি নাকি? এটা যথেষ্ট সুস্বাদু। এমনিতেও ছোটবেলা থেকেই সুজি আমার খুব প্রিয়। যখন ভাত খেতে ইচ্ছে করতো না, এটাই বানিয়ে খেতাম আমি। ”

কাবির এবার চুপ হলো। ওর মনে পড়লো সত্যি কায়েশী আগে আলসেমি করে রাতে ভাত খেতো না, সুজি খেয়ে থাকতো। কায়রাভও আর কিছু বলল না। সে এখনো একটু হতভম্ব হয়ে আছে। কায়েশী নিজের জন্য একটা বাটিতে সুজি ঢেলে নিলো। কায়রাভের পাশের চেয়ারটায় নিজে থেকে বসলো আজ। কায়রাভ পাশ ফিরে তাকিয়ে ভালোভাবেই খেয়াল করলো বিষয়টা। তারপর চুপচাপ খাওয়া শুরু করলো কায়েশী। এরপর ওকে আর কেউ খোঁচায়নি, বিরক্ত করে নি। সবাই নিজের নিজের খাবারে মন দিলো। ঘরটায় ধীরে ধীরে নেমে এলো নীরবতা। অনেকদিন পর পরিবারের সবাই মিলেছে খাবার টেবিলে, একত্রে।

#চলমান…….

[ কেমন লাগছে পর্বটি জানাবেন। গঠনমুলক মন্তব্য চাই সবার। সবাই রেসপন্স করবেন আশা করি। আর ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং। 🦋 🥀]

হাই পাঠক! 🙋‍♀️

🚫নিয়মিত গল্প পেতে ফলো রাখবেন।
আইডির লিংক-
https://www.facebook.com/profile.php?id=61576268698554

🚫আমার সব গল্পের লিংক একত্রে
https://www.facebook.com/share/p/1AZyThqcJK/

0 0 votes
Article Rating
Loading spinner
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x