লেখিকা আরিফা বিনতে মায়া
পর্ব:০২
সময়টি ছিল ২০১১সাল..
বাংলা মাস ৩০শে কার্তিক, আর ইংরেজি মাস ১১ই নভেম্বর। দিনটি ছিল শুক্রবার।
সিকান্দার পরিবারে বেশ জাকঝমক ভাবে শাহজাদী সিকান্দার আর নাহিদ শিকদারের সাথে তিন কবুলের মাধ্যমে বিবাহ সম্পূর্ণ হয়।
তবে এই বিয়ে না ছিলো কোন ভালোবাসা। না ছিল কোন পছন্দের বিয়ে। শুধু দুই পরিবারে নিজেদের রাজনৈতিক একতা রাখার জন্য বিয়ে দিয়েছে।
কারন সাদ্দাম শিকদারে সাথে বেশ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে তালহা সিকান্দারের।
তালহা সিকান্দার অবশ্যই তার মেয়েকে বিয়ে দিতে চাইনি।
তার কারন পরিস্থিতি তাকে বাধ্য করেছে নিজের মেয়ের মতের বিরুদ্ধে বিয়ে দিতে।
তালহা সিকান্দার দুই বিয়ে করেছে।
প্রথম স্ত্রী নাম ~মেহরিশ আলিফা সিকান্দার।
তাদের এক সন্তান, নাম -শাহজাদী সেহরিশ সিকান্দার। শাহজাদীর বয়স যখন ১০, তখন ওর মা মারা যায় গাড়ির এক্সিডেন্টে।
এরপরে ১বছর পর আবার তালহা সিকান্দার বিয়ে করেন।
দ্বিতীয় স্ত্রী নাম ~মারুফা মাওয়া সিকান্দার।
তার বর্তমানে তিনজন সন্তান আছে।
বড় ছেলের নাম ~ তাহের আলিফ সিকান্দার।
ছোট ছেলের নাম ~ মেহেদী জয় সিকান্দার।
মেজু মেয়ের নাম ~ মেহজাবিন আইশু সিকান্দার।
এই তিনজনের সবার বড় হলো শাহজাদী।
বর্তমানে সবাই ডাইনিং রুমে বসে আছে।
কাজি অনেকক্ষণ হলো এসেছে। পাশে সাদ্দাম শিকদার ও তার ছেলে নাহিদ বুরুজ সিকদার।
তবে নাহিদের কোন প্রকার ইচ্ছে নেই বিয়ে করার।
রাজনৈতিক কারনে তাকে বাধ্য হয়ে করতে হচ্ছে।
কিছু সময় পর শাহজাদী কে নিয়ে আসলো।
গায়ে তার জামদানী লাল পাড়ের শাড়ি, মাথায় হিজাব বাধা।
তবে মুখে কোন হাসি নেই।
বসার সাথে সাথে কাজি বিয়ে পড়ানো শুরু করে দিলো।
যখনই শাহজাদী কি কবুল বলতে বলল”
তখনই ও মনে মনে বলল-
” আজকে থেকে তোর শুরু হবে নিজের জাহান্নামী জীবন,না আছে ভালোবাসা না আছে কোন অফুরন্ত নেয়ামত।
শুধু চুক্তি পূর্ণ বিয়ে ছাড়া আর কিছুই না।”
এই ভেবে বলে দিল।” —
” আলহামদুলিল্লাহ কবুল, কবুল, কবুল “
কাজি”
আলহামদুলিল্লাহ। ”
এবার বাবা তুমি বলতো।
নাহিদ ও সেরুকুম কবুল বলে দিলো।
তাদের বিয়ে সম্পূর্ণ হলো। যার যার মতো করে বাড়ি চলে গেল।শুধু সোফার রুমে শিকাদার আর সিকান্দার সাহেবেরা বসে আছে।
এখন তালহা সিকান্দার সাহেব তার মেয়ে কে বিদায় দিবে।
তালহা সিকান্দার মেয়ের মাথায় হাত রেখে বলল”
— যদি কোন দিন মনে হয়, তুই সুখে না। অশান্তিতে আছি। তোকে উনারা মর্যাদা দিচ্ছে না।
সেদিন নির্দ্বিধায় বাড়ি এসে পড়বি।কারন তোর জন্য এই সিকান্দার মন্জিল সব সময় খোলা থাকবে। কারন বাবা হই তোর, কোনদিন চাইবো না, আমার মেয়ে অন্যের বাড়িতে গিয়ে কষ্ট পাক।
যা মা, দেরি হয়ে যাচ্ছে।
এই বলে মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন”
তার মাঝখানে সাদ্দাম শিকদার বলল ”
— তোর কেন মনে হলো তোর মেয়ে আমাদের বাড়িতে অসুখি থাকবে।
তোর মেয়ে যেমন আমার মেয়েও তেমন। এত ভাবিস না। “
কিন্তু তালহা সিকান্দার কিছুই বললেন না তার বিপরীতে, শুধু চোখ বুঝে মেয়েকে নিয়ে বাড়ির বাহিরে গেলেন। আর “শাহজাদী সে চুপচাপ পাথরের মতো তার বাবার ইশারায় চলতে থাকলো।
দেখলে মনে হবে কেউ হয়তো মাএ নতুন কোন মেসিনকে কিনা আনা হয়েছে। রিমোট টিপ দিলে চালু হবে, না বন্ধ থাকবে।”
গাড়ীতে গিয়ে তিনি মেয়েকে বসালেন, আর নাহিদ হাত টা এগিয়ে এনে শাহজাদীর হাতের উপর এনে বলল”
— বাবাহ মেয়েটাকে তোমার আমানত দিলাম।
যদি মনে হয় ভালো লাগে না, তাহলে কোনদিন কষ্ট না দিয়ে আমার সম্পদ কে আমার কাছে ফিরিয়ে দিবে। আমি কখনো মুখ ফিরিয়ে নিবো না।”
তবুও তার উপর জুলুম করো না।”
নাহিদ না চাইতে বলল”
— চিন্তা করবেন না। আমি আপনার আমানতের খেয়ানত কোনদিন করবো না।
যেহেতু আপনাকে সম্মান করি। তাই কথা দিলাম।”
এই বলে গাড়ির ড্রাইবার কে ইশারা করলো গাড়ি স্ট্রাট দিতে। আর তখন গাড়ি কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে চলে গেলো।
আর পিছন রেখে গেলো অনেকের অশ্রু শিক্ত চোখের পানি।
কিন্তু তখনই তালহা সিকান্দারের মেজু মেয়ে আইশু সিকান্দার দৌড়ে আপি আপি করতে ছুটে আসলো।
আর মাটিতে বসে পড়লো, আর হামাগুড়ি দিয়ে কাদতে কাদতে বলল”
— আপি কাজটা তুই ঠিক করলি না। পরে পস্তাবি, কারন ওরা সবগুলো জানোয়ার।
তোকে ইউজ করার জন্য নিয়ে গেছে।
কেন তুই এই রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের মধ্যে পা রেখেছিস আপা, কেন? ”
উওর চাই!
এই বলে কাদতে লাগলো। তখন তালহা সিকান্দার মেয়ের পিছন দিকে হাত দিয়ে তাকে উঠিয়ে বলে”
— চিন্তা করিস না মা ” সব একদিন ঠিক হয়ে তোর বড় বোন সেহরিশ ঠিক ফিরবে।
তখন দেখবি আর কিছুই না। তোর বাবা নিরুপায়।
এই বলে নিজের মেয়ে আইশুকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলেন আর চোখে অশ্রু সিক্ত নিয়ে বললেন।”
” হে আল্লাহ! আমার মেয়েকে সাহায্য কর।
ওই জাহান্নামে থেকে হেফাজত রেখো।”
————————————
রাত যখন গভীর, তখন ঘড়ির কাটায় ১২টা বাজে।
সদ্য ফুলের বিছানায় বসে আছে শাহজাদী।
তবে তার মনে কোন খুশি নেই।
শুধু নিজের জীবনের হিসবে গুনতে ব্যস্ত। কারন আজকে থেকে প্রত্যেকটা বিপদে মোকাবেলা করতে হবে। আর জাহান্নামী জীবন তার সুচনা হবে।
যখন এগুলো ভাবছে, ঠিক তখন রুমের দরজা খোলা আওয়াজ পেলো।
নাহিদ রুমে ডুকে সোজা অন্য পাশে সোফায় গিয়ে বসে বলল”
— আমার এই বিয়েতে তেমন কোন মত ছিলো না।
শুধু মাএ আব্বু কারনে আপনাকে বিয়ে করতে হয়েছে। তবে আমি চাই আপনি কখনো আমার কাছে নিজের স্ত্রী অধিকার নিয়ে আসবেন না।
কারন আমি আপনাকে সেই অধিকার দিবো না।
আর আমার আপনাকে দেখার ইচ্ছে নেই।
তাই আপনি আপনার মতো আমি আমার মতো।
” আর আরেকটা কথা অন্য রুমে দয়া করে থাকবেন। এই রুমে না।”
এই বলে সোফায় শুয়ে পড়লেন। একবার মুখ ফিরিয়ে দেখলো না, যে সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী কত সুন্দর ফুলের খাটে বসে তার অপেক্ষায় ছিল।
কিন্তু পাষাণ হৃদয় মানুষ সেদিন আমার মুখ তো দূরের কথা কিছুই জিজ্ঞেস করলো না। “
সেদিন শুরু হয় আমার জীবনের অধ্যায়। আমার শাশুড়ী প্রথম প্রথম আমার সাথে ভালো ব্যবহার করলে ও পরে যখন ৬মাস হয় তখন আস্তে আস্তে তার আসল রুপ বেরিয়ে আসার শুরু করেছে।
আমাকে সংসারে সব কাজ করানোর শুরু করেছে, এমন তার কাপড় আমাকে দিয়ে ধোয়ায়।
যদি বাপের বাড়ির যাওয়ার কথা বলি, তখনি আমার উপর নির্যানত শুরু আমার পাষাণ স্বামীর অগোচরে। তবে নিজের ছেলের সামনে এমন নাটক করে যে আমাকে কতই না ভালোবাসে।”
তবে দ্বীন যতই যায় ততই আমার উপর চাপ প্রয়োগ শুরু করে। কেন আমি এখন তাদের বংশের আলো করে সন্তান হয় না।কেন এতো সময় লাগে।
নাকি আমি বা*ন্জা।
হাজারো অপমান সহ্য করে আমি সংসারে টিকে রইলাম।তবে সেদিনের থাপ্পড়ে আর নিজের গায়ে গরম পানি ফেলিয়ে বুঝিয়ে দিল।এরা কেউই আমার আপন না।
তারপর নিজের বান্ধবী “শ্রেয়া” কে সব জানালাম, ও বলল আমাকে —
” শোন শাহু আমি জানি না কেন তুই ওই নাহিদ শিকদারকে বিয়ে করেছিস।তবে তোকে এইটুকু বলবো — যদি দেখিস যে ওরা তোকে তোর মর্যাদা দিচ্ছে না। সেটা করবি, যেইটা তোর মনে হয়।
তবে আমি মনে করি, তুই আরো এর থেকে বেটার ডির্জাফ করিস।
তাই নিজেকে আর ওদের কাছে ভালো সাজাতে চাইনি। আমার মতো আমি পরে রইলাম।
তবে হুট করে একদিন একজনের আগমন করলো। সে আর কেউ না তানিয়া, তখন আমি সত্যিটা জানতাম না। এরা গোপনে নাহিদ শিকদারের সাথে বিয়ে দিতে চাইছে।
কিন্তু সেদিন রাতে পাষাণ স্বামী বারান্দায় অন্য কোন নারীর সাথে কথা বলতে দেখে প্রতিজ্ঞা করলাম। জোর করে কিছুই করবো না। যা হওয়ার হবে। এখন নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা।
তাই এতোদিন চুপচাপ ছিলাম।কিন্তু চুপ থেকে লাভ কি সব তো আমার পিছনে ছুরি চালানো ব্যস্ত।
কিন্তু আজকের ঘটনা দেখে মনে হলো,
“জোর করে কখনো কিছুই আদায় করা যায় না।
যখন মানুষ নিজেকে মূল্যাহীন মনে করে, তখন সবাইকে আসল রুপ দেখাতে হয়।”
বর্তমানে…..
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এসব ভাবছে।
তারপর কি মনে করে ফোন হাতে নিল।
আর কাউকে ফোন করলো আর বললো ”
— দেখা করতে পারবি। “
অপর পাশ থেকে আওয়াজ এল”
— ঠিকাছে, ক্যাফেটেরিয়া সন্ধ্যা ৭টায়, অপেক্ষায় থাকবো।
এই বলে ফোন কেটে দিলো।
শাহজাদী জোরে নিঃশ্বাস ফেলে আলমারি থেকে কাপড় বের করে নিয়ে ওয়াসরুমে চলে গেলো।
তবে নিজে নিজে ভাবলো”
— যা হওয়ার হবে, তবে এবার আমি আমার চিন্তা ছাড়া আর কারোর জন্য করবো না…….
চলবে..?