গল্প: চলো না আজ এ রুপকথা তোমাকে শোনাই (২০)

পর্বসংখ্যা:২০

লেখনীতে:প্রিয়াংশি চৌধুরী

কাবির বোনকে কলেজ অবধি এগিয়ে দিতে খান বাড়িতে চলে এসেছে সন্ধ্যা সাতটায়। গাজীপুর যাওয়ার আগে কায়রাভ ফোন করে কাবিরকে এই একটাই দায়িত্ব দিয়ে গেছে। কায়রাকে বাস পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসতে। শুধু তাই না, বাসে তুলে দিয়ে একদম সিটে বসিয়ে দিয়ে আসার আদেশ দিয়েছে। খান বাড়ির দারগোড়ায় দাঁড়িয়েই কাবির ডাকাডাকি শুরু করেছে। যদিও ওটাকে ডাকাডাকি না রীতিমতো চেঁচামেচি করা বলে। কাবির ডাকতে থাকে,
“কায়রা! আরে এই ছে’ম’রি! তারাতাড়ি আয়!”

ভেতর থেকে ভেসে এলো কায়রার জবাব,
“আসছি, আসছি! আর পাঁচ মিনিট, ভাইজান।”

কিন্তু সেই আসছি আর আসছে না। কাবিরের গলার আওয়াজ শুনে কায়েশী নিচে নেমে আসে। সঙ্গে গোলুমোলু সাদাকালো পান্ডার পোশাকে কায়ান। মাথায় টুপি দেওয়া। এদিকে কায়েশী কাবিরকে দেখে সে বেশ প্রস্তুতি নিয়ে এসে দাঁড়িয়ে আছে। সাদা শার্টের উপর ডেনিম জ্যাকেট। সাথে চকচকে সাদা শু। যেন কায়রা নয়, কাবির নিজেই ঘুরতে যাবে বলে এতো প্রস্তুতি। যাগগে, অযাচিত ভাবনা দূরে সরিয়ে কায়েশী ধীর, শান্ত স্বরে বলল,
“ভেতরে এসে বসো। ততক্ষণে কায়রা চলে আসবে।”

সেসব কথার ধ্যান নেই কাবিরের। কারণ, কাবিরের চোখ তখন আটকে গেছে কায়ানের দিকে। গোল পান্ডার ড্রেসে ওকে দেখে সে আর এক সেকেন্ড দেরি করলো না। চট করে কোলে তুলে নিলো কায়ানকে। কায়ানকে গোটা দশেক চুমু খেয়ে কায়েশীকে নাকোচ করে বলল,
“নাহ, এখন ভেতরে যামু না। গেলে আবার শু-লেস খুলতে হইবো। এইডা বানতেই দুই দিন লাগে আমার!”

কায়েশী আর কিছু বলল না। এদিকে কায়ান ছোট্ট দু’হাত দিয়ে কাবিরের গলা জড়িয়ে ধরে ওর চকচকে পোশাকের দিকে তাকিয়ে থাকে গোলগোল চোখে। ওর মাথায় ধরতে দেরি হয় না যে তার চাচ্চু আজ কোথাও যাচ্ছে। সে ঘুরতে যাওয়ার বিষয়ে বরাবরের মতো আগ্রহী হয়ে আধো আধো গলায় জিজ্ঞেস করে,
“কোতায় যাবে, চাচু? আমিও যাবো!”

কায়েশী তা শুনে দ্রুত মানা করে বলল,
“না, এই রাতের বেলা কোথাও যাওয়া হবে না। ঘরে বসে মুখে মুখে পড়া দেবে তুমি।”

এই কথা শুনে কায়ান আর কাবির দুজনেই একসঙ্গে মুখ কুঁচকে ফেললো। একজন পড়ালেখার ভয়ে, আরেকজন একেবারেই অকারণে। কাবির স্বভাবসিদ্ধ ভাবে বলল,
“কায়ান যাইবো আমার সাথে। সারাদিন এমনেই পোলাডারে ঘরে রাইখা ঘরকুনা বানাইতাছেন! এখন সুযোগ আছে, যাইবো না ক্যান? আমি নিয়া যাইতাছি। ঠিক সময়ে মুরগির বাচ্চাটারে বাড়িতে আইসা পার্সেল দিয়া যামুনে। টেনশন নট!”

কায়েশী নির্জীব দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো কাবিরের দিকে। জানে, এই ছেলেটার সঙ্গে এখন তর্ক করে কোনো লাভ নেই। তাই অযথা তর্কে গেলো না। কাবির প্যান্টের পকেটে হাতড়ে তিনটে আচারের প্যাকেট বের করে। এগুলো সে কায়েশীর জন্যই এনেছিলো। তাই কায়েশীর দিকে আচারের প্যাকেটগুলো বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“এইডি নেন। ইন্ডিয়ান আচার। এক বন্ধু গেছিলো, তখন নিয়া আসছে।”

কায়েশী খানিকটা থমকে গিয়ে বলল,
“আমি নেবো?”

কাবির মাথা নাড়লো। কায়েশী হাত বাড়িয়ে প্যাকেট তিনটি নিলো। কাবির একটু স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“আগে আমাদের একটা সহজ-সুন্দর সম্পর্ক আছিলো, বন্ধুত্ব। আর এই কয় বছরে দেবর-ভাবী। এই সহজ সম্পর্কগুলারে অযথা জটিল বানানোর কারণ আমি দেখি না। সবকিছুতে এতো দ্বিধা, এতো সংকোচ এইগুলার তো আরো কারণ নাই। অতীতে যাইহোক, জীবন তো আর থাইমা থাকে না।”

কায়েশী আলতো একটা নিঃশ্বাস ফেললো,
“সবকিছু কি সত্যিই এতো সহজ? তবে এটা সত্যি
আমি এগিয়েছি। অনেকটাই।”

কাবির কায়ানকে একটু উঁচু করে ধরে হেসে বলল,
“দিস ইজ দ্য বেস্ট প্রুভ! এর চাইতে বড় প্রমাণ আর হইতেই পারে না।”

কায়েশীর ঠোঁটেও হালকা হাসি খেলে যায়। হঠাৎ তার চোখ পড়ে কাবিরের বাম হাতে থাকা কালো ফ্রেন্ডশিপ ব্যান্ডটার দিকে। ফ্রেন্ডশিপ ফরএভার লেখা তাতে। এই ব্যান্ডটা সে নিজেই কিনেছিলো একজোড়া। কয়েক বছর আগে নিজ হাতে পরিয়ে দিয়েছিলো কাবিরকে। এতদিন পরও সেটা ও পরে আছে, হারায়নি। এই ভেবে অবাক হয় কায়েশী। এতদিন খেয়াল করেনি। তাই মুখ ফসকে বেরিয়ে যায়,
“এই ব্যান্ড! এটা এখনো আছে তোমার কাছে?”

কাবির ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে একেবারে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
“না থাকার কি? আপনার হাতেও তো আছে দেখতাছি। তাছাড়া বন্ধুত্বের সম্পর্কটা আমি শুরু থেকেই পালন করছি। বিয়ের পর পিছায়া আসছিলেন আপনি। এমন ভাব যেন আমাকে চিনেন’ই না! কোন জন্মের এক্স লাগি আপনের, আজাইরা ঢং!”

কায়েশী বিদ্রুপের স্বরে বলে,
“এতো বন্ধুত্ব পালন করেছো যে তুমি থেকে আপনিতে এসেছো! এটা কি অপরিচিত বিহেভিয়ারের সাথে যায় না?”

কাবির মৃদু শ্বাস ফেলে বলে,
“ওইডা সম্পর্কের খাতিরে। বড় ভাইয়ের বউরে তুমি-তুমি কইতে পারুম না! তাছাড়া বন্ধুত্বে এইসব ফ্যাক্ট না। ”

কায়েশী ভ্রু কুঁচকে খানিকটা রাগী গলায় বলল,
“তোমাদের তিন ভাইবোনের একটা জিনিস দেখে আমার মাঝে মাঝে ভীষণ রাগ হয়। আবার এমন বন্ডিং দেখে ভালোও লাগে। রাগের কারণটা হলো, তোমরা নিজেদের এবং ভাইবোনদের দোষ কখনো দেখতেই পাও না। মানে, যদি তোমার ভাই খুনও করে, তাও তোমরা বুক ফুলিয়ে বলবে- আমার ভাই যেহেতু করেছে, তাহলে ঠিকই করেছে!”

কাবির এ কথায় হো হো করে জোরে হেসে ফেললো। পরমুহূর্তে হাসি থামিয়ে বলে,
“এই কথা এক্কেরে খাঁটি সত্য, ভাবী! কিন্তু একটা সত্য কথা আমিও কই শুনেন- আপনার জন্য যদি বেস্ট কেউ থাকে, তাহলে সেইটা নিঃসন্দেহে আমার ভাইজান। সে মানুষ যেমন হিসেবেও খাঁটি, তেমন তার ভালোবাসাটাও খাঁটি। একজন মানুষের নিরানব্বইটা ভালো কাজরে জাস্টিফাই করা হয়। একটা মিস্টেক করলেও সেইটা ধরা উচিত না। এইডা আপনিও বুঝবেন একদিন। দোয়া কইরা দেই, একদিন আমার ভাই-ভাবীর ভালোবাসা যেন লাইলি-মজনুর মতো গাঢ় হয়। ফুউউউ’উ!”

কায়েশী মুখ কুঁচকে মৃদু আহাজারি করে বলল,
“আল্লাহ! এটা জীবনে শোধরাবে না!”

এই কথা বলেই সে দ্রুত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরের ঘরে চলে যায়। আর নিচে দাঁড়িয়ে কাবির হেসেই চলে। সেই উচ্চস্বরের হাসির শব্দে ভরে উঠে খান বাড়ি। এরপর কায়রা ছোট একটি ব্যাগ হাতে নিয়ে বেরিয়ে এলো নিজের ঘর থেকে। তার পরনে কালো কুর্তি আর জিন্স প্যান্ট। গলায় সাদা মাফলার পেচানো। রাতে শীত বাড়বে বিধায় ঠান্ডা লাগবে তাই এই মাফলার নিয়েছে। ওর এমনিতেই ঠান্ডা লাগলে গলার সমস্যা হয়। এই শীতে ব্যথাও হয়েছে। তাই আগেভাগেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে সে। এদিকে কায়রার দেরি হওয়ায় কাবির বলল,
“আরও দেরি করতি! বাস ছাইড়া দেওয়ার পর যাইতাম!”

কায়রা হালকা করে হেসে বলল,
“রেডি হতেই লেট হয়ে গেল। মেয়েদের রেডি হতে একটু বেশি সময় লাগে। বিয়ে করলে বুঝবে, ভাইজান। এখন তো আমাকে অবলা পেয়ে মেজাজ দেখাচ্ছো। এবার চলো, চলো।”

কাবির কায়রার কথায় মাছি তাড়াবার মতো ভান করলো। পাত্তাই দিলো না। এরপর কায়ানকে কোলে নিয়ে কায়রার সাথে করে বেরিয়ে পড়লো। তাদের লক্ষ্য ভার্সিটি। সেখান থেকেই গাড়ি ছাড়বে। তারাতাড়ি পৌছাতে পথে নেওয়া হলো একটি ছোট রিক্সা। আস্তে আস্তে এগিয়ে যেতে লাগলো। রাতের হালকা হাওয়ায় মাফলারটা কায়রা গলার চারপাশে নরমভাবে জড়িয়ে ফেললো। আর কাবিরের কাঁধে কায়ান মাথা রেখে রাতের শহরটা দেখছে গোলগোল চোখে। রাস্তায় চারপাশে লাইটিং দেখে মাঝে মাঝে হাতও নাড়াচ্ছে উচ্ছ্বাসে।

——————————————–

অবশেষে ভার্সিটির মাঠে পা রাখলো কাবির আর কায়রা। শীতের রাতে হালকা কুয়াশায় মাঠটা অদ্ভুত এক উৎসবের আমেজে ভরে আছে। সামান্য ঝাপসা চারপাশ। চারদিকে ব্যস্ততা, ব্যাগ কাঁধে শিক্ষার্থীদের ছোটাছুটি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কায়রাকে আসতে দেখেই দিপ্তি আর জিহাদ এগিয়ে এলো। দিপ্তি চাপা গলায় বলল,
“আরেকটু আগে আসবি না? এতো দেরিতে কে আসে বল তো!”

জিহাদ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে গম্ভীর সুরে বলল,
” হুম, আর কুড়ি মিনিট পরই কিন্তু বাস ছাড়বে।”

কায়রা দু’জনের দিকে তাকিয়ে হালকা হাঁফ ছাড়লো। লক্ষ্য করলো জিসান আসে নি। তাই জিজ্ঞেস করে,
” জিসান আসে নি? ওকে তো দেখছি না।”

জিহাদ কাঁধ ঝাঁকালো,
“কয়েকদিন ধরে ওর কোনো খবর নেই। মেসেজ করেছিলাম, রিপ্লাই পাইনি।”

কায়রা ঠোঁট গোল করে নিঃশ্বাস ফেললো। বিরক্তির স্বরে বলে,
“হোয়াটএভার!”

কাবির তখন পর্যন্ত চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলো। সে বলল,
“তাহলে আমি যাই। সব নিছস তো ব্যাগে? আরেকবার চেক দে।”

কায়রা ব্যাগের চেন খুলে তাড়াতাড়ি চোখ বুলিয়ে নিলো। হঠাৎ মুখ বিকৃত করে বলল,
“ওহ হো! পানির বোতলটাই নেই। ভাবী পানি ভরে টেবিলে রেখে দিয়েছিলো… একদম মাথা থেকে বেরিয়ে গেছে। শি’ট!”

কাবির হালকা হেসে বলল,
“দাঁড়া, সামনের দোকান থেকে আইনা দিতাছি।”

কায়ানকে সঙ্গে নিয়ে কাবির দ্রুত দোকানে গেলো। কিছুক্ষণ পর এক লিটারের বোতল হাতে ফিরে এসে কায়রার দিকে বাড়িয়ে দিলো।
” রাখ। এবার তাইলে চলি। সাবধানে থাকবি।”

কায়রা কায়ানকে চুমু দিয়ে হাত নাড়িয়ে বলল,
“ওকে, ওকে। টাটা, কায়ান!”

কায়ানও ছোট্ট হাত নেড়ে বলল,
” টাটা পুপি! ”

এক মুহূর্ত পর কাবির আর কায়ান ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে গেলো। দিপ্তি ফিসফিস করে বলল,
” ইয়ার! এটাই তোর সেই ছোট ভাইজান?”

কায়রা হাঁটতে হাঁটতে বাসে উঠতে উঠতে বলল,
“হুম, কেন?”

দিপ্তি চোখ বড় বড় করে বলল,
“হি ইজ ড্যা’ম হ্যান্ডসা’ম! তোর ছোট ভাইকে আগে দেখিনি। বড় ভাইকে অবশ্য টিভিতে দেখেছি। আর এখন তো আমাদের এমপি সে।”

কায়রা হেসে মাথা নাড়লো,
“নজর দিয়ে লাভ নেই। আমার দুই ভাইজান’ই ফিক্সড।”

দিপ্তি বুক চেপে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,
“দিল টু’ট গেয়া!”

জিহাদ আর কায়রা একসাথে হেসে উঠলো এবার। জিহাদ মুচকি হেসে বলল,
“তোর বয়ফ্রেন্ড আসছে। ভন্ডামি বাদ দিয়ে এখন শান্ত হয়ে বস।”

দিপ্তি তড়িঘড়ি নিজের সিটে গুছিয়ে বসলো। ওরা বন্ধুরা মিলে আগেই সিট প্ল্যান করে রেখেছিলো।  সামনের দ্বিতীয় সারির জানালার পাশের সিটে বসার কথা কায়রার। তারপর দিপ্তি ও তার বয়ফ্রেন্ড, শেষে জিহাদ। মোট সত্তর জনের মতো শিক্ষার্থী যাচ্ছে এই ট্যুরে, সঙ্গে পাঁচজন শিক্ষক। এইবার শুধু ডিপার্টমেন্ট ভিত্তিক শিক্ষক নেওয়া হয়েছে। মোট দুটো বাস যাবে। প্রথম বাসেই উঠেছে কায়রা ও তার বন্ধুরা। তাই শিক্ষকরাও এই বাসেই উঠবে। প্রীষান আর আমিনুল স্যার বাসে উঠতেই এক মুহূর্তের জন্য কায়রার বুকের ভেতরটা ধ’ক করে উঠলো প্রীষানকে দেখে।

প্রীষানের পরনে হোয়াইট ডেনিম শার্ট। হাতা দু’টি সুচারুভাবে গোটানো। তার উপর নেভি ব্লু জ্যাকেট। শার্টের সঙ্গে মানানসই হোয়াইট রঙের কার্গো ট্রাউজার। যা আরামদায়ক, আবার মার্জিত শোভা দিচ্ছে। আর কাঁধে ঝোলানো একটি সাদামাটা ব্যাকপ্যাক। প্রীষানের পোশাকের মধ্যেও সুরুচিসম্মত ব্যক্তিত্বের বিশেষ ছাপ ফুটে উঠছে। যা সুশৃঙ্খল, পরিমিত এবং ভীষন ম্যান’লি। কায়রার কাছে এসব পুরুষালি সৌন্দর্যের সমন্বয়। সরল ভঙ্গি অথচ দৃঢ় কি উপস্থিতির জানান দিচ্ছে।

এই যে কায়রা বেহায়ার মতো তাকিয়ে আছে এখন সবাই বলবে, দোষ কায়রার। চোখে এতো স্পষ্ট মুগ্ধতা নাকি শোভা পায় না নারীদের। মেয়েদের নাকি এতোখানি প্রকাশ মানায় না। সমাজ খুব সহজেই আঙুল তুলবে তার দিকে। দৃষ্টিরও মাত্রা আছে, আর সেই মাত্রার বেড়া টপকালেই অপরাধ। কিন্তু কেউ কি একবারও ভাববে না, প্রীষানের দিকটা? ওই যে তার অতিরিক্ত পুরুষালী সৌন্দর্য। হ্যাঁ, অতিরিক্তই তো! এমন সৌন্দর্য যেখানে চোখ আটকে যায়। দৃষ্টি সরাতে মন চায় না কায়রা। এতে কায়রা বেহায়া উপাধি পেলে পাক। কিন্তু সে দেখবে, তার স্বপ্নপুরুষকে মন ভরে দেখবে। তার ভ্রুর গাঢ় রেখা, চোয়ালের দৃঢ়তা, চোখের গভীর স্থিরতা সবকিছুতেই কায়রা আটকায়। তাই ও দেখছে, দেখেই চলেছে। এখানে কায়রার দোষ কোথায় তবে? সে তো কেবল মানুষ। তার হৃদয়ও তো রক্তমাংসের, তারও স্বপ্নপুরুষের প্রতি আগ্রহ জাগে। অতিরিক্ত বলেই তো মন হারিয়েছে। পরিমিত সৌন্দর্যে এমন সর্বনাশ হয় না। কিছু কিছু রূপ থাকে, যা নিয়ম মানে না। হৃদয়ের ভেতর ঝড় তোলে অনায়াসে। আর কায়রার মতো অভাগীর তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা রাখে না। তাই যদি দোষ দিতেই হয় তাহলে দোষ দাও সেই পুরুষালী সৌন্দর্যকে, প্রীষানকেও। কায়রা কেন শুধু শুধু একা দোষের ভাগীদার হবে? যে সৌন্দর্য নিজের দীপ্তিতে অন্যের সংযম গলিয়ে দেয়। কায়রা তো শুধু তাকিয়েছিলো। আসলে তার চোখে যে বিস্ময় তা প্রীষানের সৌন্দর্যেরই প্রতিচ্ছবি। মনে মনে এসব অযাচিত ভাবনা ভাবছিলো কায়রা।

এর মাঝেই প্রীষান বাম পাশের দ্বিতীয় সারিতে আমিনুল স্যারের পাশে বসলো। আমিনুল স্যার জানালার ধারে বসেছে। কায়রা এবার খেয়াল করে দেখলো, তারা একই লাইনে বসেছে। তার ঠোঁটে অবচেতনে এক হাসি ফুটলো। কিন্তু সেই হাসি মিলিয়ে গেল পরক্ষণেই। কারণ, তার আর প্রীষানের মাঝখানে বসে আছে এক অচেনা মেয়ে। নাহ, এটা মেনে নেওয়া যায় না। এটাকে মাঝখান থেকে সরাতে হবে যেভাবেই হোক। তাই বুদ্ধি খাটিয়ে কায়রা পাশে বসা মেয়েটির দিকে ঘুরে কোমল হাসি দিলো। জিজ্ঞেস করলো,
“হাই, তোমার নাম কী? একই ডিপার্টমেন্টে পড়ি, অথচ চিনি না তো!”

মেয়েটি স্বাভাবিকভাবেই বলল,
” আমি রিয়া।”

“নাইস নেম। আচ্ছা, তুমি কি জানালার পাশে বসবে?”

রিয়া বিস্মিত হয়ে তাকালো,
“জানালার সিট ছেড়ে দিতে চাও?”

কায়রা জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে একটু ভেবে নিয়ে বলল,
“আসলে আমার ঠান্ডার একটু সমস্যা আছে। একবার লাগলে মাসখানেকের আগে যায় না। জানালার ধারে বসলে ঠান্ডা বাতাস লাগে তো… তাই ভাবলাম।”

রিয়া তো জানালার সিট পেয়ে খুশিই হলো। তাই তারাতাড়ি করে বলল,
“ওহ, আচ্ছা! তাহলে তুমি আমার সিটে বসো।”

কায়রা ধীরে ধীরে সিট বদলে বসলো। এখন তার আর প্রীষানের মাঝে শুধু যাতায়াতের ফাঁকটুকু। দূরত্বটা খুব বেশি নয়, আবার খুব কমও নয়। ঠিক যেমনটা তাদের অগোছালো নামহীন সম্পর্ক। পেছন থেকে দিপ্তির চাপা গলা ভেসে এলো,
“কিরে! এতো কষ্ট করে জানালার সিট ম্যানেজ করলি, আবার ছাড়লি কেন?”

কায়রা দিপ্তির দিকে তাকিয়ে শুধু মুচকি হাসলো। কোনো উত্তর দিলো না। দিপ্তি কায়রার মুখের চেনা উজ্জ্বলতা খেয়াল করে পাশের সারিতে প্রীষান স্যারকে বসা দেখে সব বুঝে গেলো। নিজেও ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি টেনে নিলো। আর প্রীষান সবই লক্ষ্য করছিলো এতক্ষন। তবু কিছুই দেখেনি এমন ভান করে নিজের ফোন ঘাটছিলো। তার মুখে নির্লিপ্ততার ছায়া। কিন্তু সেই নির্লিপ্ততার আড়ালে কী লুকিয়ে আছে তা বোঝার সাধ্য কারও নেই।

পরক্ষণেই বাসের ইঞ্জিন গর্জে উঠলো। ভ্রমণের যাত্রা শুরু হলো, আর সঙ্গে সঙ্গে শুরু হলো কিছু অদৃশ্য অনুভূতিরও। যার ভবিষ্যৎ গন্তব্য এখনো অজানা।

#চলমান…….

[ কেমন লাগছে পর্বটি জানাবেন। গঠনমুলক মন্তব্য চাই সবার। সবাই রেসপন্স করবেন আশা করি। আর ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং। 🦋 🥀]

5 1 vote
Article Rating
Loading spinner
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x