Golpo:Prem Samadhi (01)

২০১২ সাল…..
ডিসেম্বরের শেষের দিক।”
শীত নেমেছে গভীরভাবে—হিমেল বাতাসে শ্বাস নিলেই বুকের ভেতর কাঁপন ধরে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কুয়াশার চাদরে ঢাকা রাস্তা-ঘাট, ল্যাম্পপোস্টের আলো ঝাপসা হয়ে ভেসে ওঠে। মানুষজন ভারী শীতের কাপড়ে মোড়া, হাত পকেটে ঢুকিয়ে তাড়াহুড়ো করে হাঁটছে। কোথাও চায়ের দোকানে ভিড়, ধোঁয়া ওঠা কাপে উষ্ণতার খোঁজ; কোথাও রিকশার ঘণ্টার শব্দ, গাড়ির হালকা হর্ন—সব মিলিয়ে শহরটা যেন ঠান্ডার মাঝেও জীবন্ত। শীতের নীরবতা আর মানুষের ব্যস্ততা একসাথে মিশে, সময়টা হয়ে উঠেছিল আলাদা রকম সুন্দর।
শিকদার বাড়ি……..
দুই তলা, তবে বড় বারান্দা ও অর্ধেক ছাদ খোলা।পুরনো ইটের, কিছু জায়গায় পুরানোর ছাপ, দেয়ালে খুঁড়ে দেওয়া ছবি ও পুরনো গায়ে ঢেউখাতার রঙের পালিশ, জানালায় ধূসর ফাইবার গ্লাস।সামনে ছোট লন, কয়েকটি আঙুর গাছ, লাল ফুলের কিছু ঝোপ। পেছনের উঠোনে মাটি, পাথর, ও কিছু পুরনো লাঠি ছড়িয়ে আছে।বারান্দা বড়, বাঁশের রেলিং, কিছু জায়গায় ছেঁড়া টাটকা কাপড় ঝুলছে।
নীরবতা মাঝে মাঝে ছিঁড়ে দেয় দূরের রাস্তার আওয়াজ। ধোঁয়া ভেসে আসে রান্নাঘর থেকে বা বারান্দা থেকে। সূর্য পড়লে পুরনো দেয়ালের ছায়া লম্বা হয়, গাছের পাতা নড়ে।
শিকদার বাড়ি দুই তলা, সামনে–পেছনে বাগান, বড় বারান্দা, তবে বাড়ির পরিবেশ বেশ ধম ধমে।

এরিমধ্যে বাড়ির থেকে বেশ চিৎকার শোনা যাচ্ছে, কেউ বাড়ি মাথায় গড়ে কাউকে ডাকছে।
যেমন…….

— ফাতেমা….. এই ফাতেমা!  কিরে তোদের কি কোন হুশ জ্ঞান নেই।সকাল হয়েছে সেই কখন, এখন আমাকে চা দেওয়ার কোন নাম গন্ধ নেই।
সবাই কি মরেছিস নাকি।”

— আরে আপা এতো চিৎকার করছো কেন?
এই যে চায়ের ট্রে হাজির।

— আমি তো শুধু চিৎকার করি, যতো জ্বালা আমার। দে… চা দে,

— আচ্ছা দিচ্ছি!
“তারপর চা ঢেলে, হাতে দিল “

— ঠিকাছে, তাড়াতাড়ি দে।
আচ্ছা ওই নবাবের বেডি কই? সকাল থেকে দেখছি না। নাকি সারাদিন শুয়ে বসে খাওয়ার দ্বীন গেল, অথচ বছর শেষ এখন বাচ্চার মা হতে পারলো না।

— আহা” থাম্মে তুমি আপা! আমি ডাকছি তো।
“শাহজাদী ভাবি…ও শাহজাদী ভাবি! কোথায় তুমি? তোমার শাশুড়ী মা ডাকছে?

ঠিক তখনই আওয়াজ আসলো।”
—আসছি…..

এরপরে বারান্দার ফটক থেকে পায়ে হেটে এক তরুনী আসছে।
যার গায়ে সাদা রঙের থ্রিপিজ, মাথায় ওড়না দেওয়া। চোখগুলো সাদা মণি,মুখে তার মিষ্টি হাসি।
হাটতে হাটতে ঠিক সামনে এসে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে নিজেই ঢেলে দিল, আর বলল”

— আপনি এতো চিৎকার করলে তো শরীর খারাপ করবে। তার থেকে নিন আমার হাতে এক কাপ চা খান, সব ঠিক হয়ে যাবে।
এই বলে কাপটা হাতে এগিয়ে দিলে, হাফসা বেগম সোজা কাপটা ফেলে দিলেন আর বললেন”

—মশকরা কর আমার সাথে, খেয়ে দেয়ে কাজ নাই। সকালে দেরি করে ওঠে, এখন আমার সাথে তামসা করছ।কার দায়িত্ব ছিল, যে সকালে চা খাওয়াবে। যদি দায়িত্ব নাই পালন কর, তাহলে দায়িত্ব নেওয়ার প্রয়োজন নেই, সোজা বাপের বাড়ি যাও কেউ মানা করে নি।
অবশ্যইএই বাড়িতে থেকে কি লাভ, যদি সন্তানি জন্ম দিতে না পারো।

এই বলে তিনি চলে গেলেন, আর শাহজাদী দাঁড়িয়ে রইলেন। কোন কথার জবাব দিলো না।”

তাহল চলুন পরিচয় পর্বটা দি……

একটু আগে যাকে কথা শুনালো না, ওই হলো আমাদের গল্পের নায়িকা ~শাহাজাদী সেহেরিশ সিকান্দার,বয়স-১৯,
দেখতে বেশ মাশাল্লাহ , চোখ গুলো টানা টানা, চোখের মণি সাদার মধ্যে কালো, তবে তার সৌন্দর্য প্রশংসা করবো ততই কম হয়ে যায়।
গায়ের রং দুধে আলতা ফর্সা, লম্বা -৫ফিট দের ইন্জি।

আর যে এতো সময় চিৎকার করেছে তার নাম ~হাফসা খানম শিকদার, আর তার স্বামী ~ সাদ্দাম শিকদার, আর তাদের দুইজন সন্তান রয়েছে।  বড় ছেলের নাম ~ নাহিদ বুরুজ শিকদার আর ছোট মেয়ের নাম ~নুসাইবা শিকদার
তাদের বড় ছেলের সাথে শাহজাদীর বিয়ে হয়েছে।
কিন্তু তাদের বিয়ের বয়স একবছর শেষ হতে চলল।
কিন্তু তাদের মধ্যে কি নিয়ে সমস্যা, তা জানতে পারবেন সামনে।

তাহলে আসুন গল্পে ফিরা যাক,

শাহদাজী চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। ঠিক তখন ই ওর পিছনে হাত রাখলো সেই বাড়ির মেড হাসিবা
আর বলল”

— কিছুই চিন্তা করো না, সব ঠিক হয়ে যাবে।জানো না কেন এমন করে?

তখন শাহজাদী তার হাতের উপর হাত রেখে বলল”
— কিছুই হয়নি খালা, আমি ঠিক আছি।
তবে আমার রোজ অভ্যাস হয়ে গেছে তাদের তিক্ত কথা শুনতে শুনতে।
এ আর নতুন কি!

এই বলে চোখের পানি মুছে, আবার বলল—

“আচ্ছা হাসিবা খালা, তুমি রান্না ঘরে যাও। আমি আসছি।

এই বলে চলে গেল শাহজাদী। “

আর হাসিবা ওখানে দাড়িয়ে থেকে দুই হাত তুলে বলল—
” হে আল্লাহ!  তুমি এই মেয়ে কে হেফাজত করো।
এ বাড়ির সবাই তাকে অবহেলা করে। কোন সময় না হাফসা আপা মেরে ফেলে।
যা শুরু করেছে….
এই বলে হাত চোখের উপর মুছে রান্না ঘরে চলে গেল।
——————————–
সকাল ৯টা…….
শিকদার বাড়ি বেশ শান্ত পরিবেশ, তবে উরাধুরা কাজে ব্যস্ত শাহজাদী, কারোর জন্য পরোটা, বা কারোর জন্য বিভিন্ন আইডেমের নাস্তা বানাতে ।
কারন ওর উপর এ বাড়ির সব দায়িত্ব দেওয়া, খাওয়া হতে শুরু করে সব, এমনি সংসারের চাবিটা ওর কাছে।

একে একে সবাই নাস্তার টেবিলে আসতে শুরু করল। তখনই হাফসা বেগম চিৎকার করে বলল”

— শাহজাদী….  কোথায় আমার নাস্তা?
রোজ রোজ একি কথা শিখাতে ভালো লাগে না।
কবে এই মুখপুরি ঠিক হবে, কে জানে?

— এই তো আম্মা,, আপনার টেবিলে নাস্তা রাখা আছে। ওখান থেকে তুলে খেয়ে নিন।

যখনই হাফসা খানম কিছু বলতে নিবে, তখনই সাদ্দাম শিকদার ওর তার ছেলে মেয়ে টেবিলে এসে হাজির হলো।
আর শাহজাদী সাথে সাথে নাহিদের খাবার তার সামনে রাখলো।
আর বলল”
— আপনি যা পছন্দ করেন, তাই করেছি। যদি কোন কিছু বাদ থাকে অবশ্যই বলবেন।

নাহিদ শাহজাদীর দিকে না তাকিয়ে খাওয়া শুরু করলো। আর তার মা এইটা দেখে মেজাজ খারাপ হয়ে সাথে সাথে পরোটা নিয়ে কামড় বসিয়ে বলল”

— তোমাদের সবার সাথে আমার একটা কথা আছে? যা অনেক জরুরি।

সাদ্দাম শিকদার — কি বলবে বল?

— কথাটা হলো…. তার আগে বল আমার কথা সবাই শুনবে, না হলে কিন্তু?

নাহিদ— আম্মা কি বলবে বল?কেন  শুধু শুধু ভয় দেখাচ্ছ।

— আরে আমি কই ভয় দেখালাম?এমনি বললাম আর কি। “

নুসাইবা — আম্মু তুমি কি বলবে?  আমি কিন্তু ওয়েট করে থাকতে পারছি না।”

— তাহলে সবাই শুন…..
আমি আবার বুরুজ কে ২বিয়ে করাতে চলেছি।

সবাই এই কথা শুনে চুপ হয়ে গেল, আর পুরো ডাইনিং রুমে বিস্ফোরণ ঘটলো।
আর শাহজাদী, সে তো রোবটের মতো দাড়িয়ে আছে। মুখে কোন কথা নেই।

তখনই সাদ্দাম শিকদার বললেন —
” তুমি পাগল হয়ে গেছ হাফছা, কি সব যা তা বলছ! ছেলের বিয়ে মানে..
ছেলের তো বিয়ে হয়েছে, আর খুব সুন্দর মেয়ে দেখে বিয়ে করালাম। আর তুমি এখন আবার বিয়ে ?

— তুমি থামবে বুরুজের বাবা…. কোন মেয়ের কথা বলছ। যেই মেয়ে বছর শেষ হতে চলল,এখন পযন্ত মা হওয়ার খবর শুনাতে পারলো না। সে হলো আমার ছেলের বউ, আমি মানবো?

” তখন তো তুমি পাগল হয়ে বিয়ে দিয়েছো।
নিজের নিবার্চন জেতার জন্য, বিপদে পড়েছো বলে। না হলে আমি রাহেলের মেয়ে তানিয়ার সাথে বিয়ে করাতাম।আর আমার ছেলেও তানিয়াকে ভালোবাসে।
তাছাড়া যে মেয়ের মা হওয়ার ক্ষমতা নেই, তাকে আমি পুএবধূ হিসেবে মানি না।
যদি ছেলেকে বিয়ে করাই তাহলে শাহজাদী ওর মতো করে থাকবে, ওর জায়গা তো আর কেউ দখল করছে না। আর ছোট বউ আসবে, আমাদের বংশের কে আলো করতে।
তাই আমি আমার ছেলেকে বিয়ে করাবো।

সাদ্দাম শিকদার — কিন্তু হাফছা…

— কোন কিন্তু না, এটাই আমার শেষ কথা।

এরপরে নাহিদের দিকে তাকিয়ে বলল”
—তোর কোন আপওি নেই তো বাবাহ!
আমি কিন্তু তোর ভালোর জন্য বলছি।তোর তো সন্তানের প্রয়োজন, তাই না।”

এইদিকে শাহজাদী নিরব দর্শকের মতো সব শুনে যাচ্ছে গোমটার আড়ালে, অথচ কেউ খেয়াল করলা না ওর কত কষ্ট লাগছে। এ বাড়িতে নিয়ম বাড়ির বউ সকলের সামনে কথা বলতে পারবে না, উচু আওয়াজ তো দূর কোন শব্দই করতে পারবে না।
শাহজাদী এই টুকু আশায় আছে, যদি কোন রকম তার পাষান্ড স্বামী বিয়েতে না রাজি হয়।তাহলে আল্লাহ কাছে হাজার হাজার শুকরিয়া আদায় করবে।
কিন্তু তাকে ভুল প্রমান করে বলল”
— তোমাদের যা খুশি কর, আমার কোন আপত্তি নেই।
এখন আমাকে পার্টির অফিসে যেতে হবে।
আর বিয়ে কবে সেই তারিখ ঠিক করে আমাকে জানিয়েও।
আমি আসছি।”

এইবলে খাবারের টেবিল থেকে উঠে চলে গেল।
আর হাফসা আর নুসাইবা মা মেয়ে খুশিতে একে অপরের জড়িয়ে ধরল।
শাহজাদী নিজেকে আর ধরে রাখতে না পেরে উপরে চলে গেল।

তখন পেছন থেকে হাফসা বলল—
” শুনেন নবাবজাদি.. আমার ছোট বউমা খুব শীঘ্রই আসছে।
দয়া করে ঘরটা খালি করে অন্য ঘরে চলে যাবেন।
আমাকে যেন বলা না লাগে।

আর নুসাইবা চল, আমরা কেনা কাটা করি। অনেক কাজ বাকি আছে তো। তোর একমাএ ভাইয়ের বিয়ে বলে কথা  চল।”
এই বলে তারা তাদের মতো করে চলে গেল।”

আর শাহজাদী নিজের রুমে দরজা লাগিয়ে কান্না কাটি শুরু করলো।
আর নিজেকে আয়নায় দেখে কান্না কাটি বন্ধ করে পুরানো অতীতে ডুব দিলো……

লেখিকা আরিফা বিনতে মায়া
সুচনা পর্ব

চলবে……..

( আসসালামু আলাইকুম প্রিয় পাঠক পাঠিকা গণ সবাই কেমন আছো,
তোমাদের মাঝে নতুন ভিন্ন গল্প নিয়ে হাজির হলাম  প্রেম সমাধি
ক্যাটাগিরি:  রাজনৈতিক, রোমান্টিক, থ্রিলার সব মিলিয়ে ভিন্ন স্বাদের গল্প।
প্রথম পর্ব দিলাম, কেমন হয়েছে অবশ্যই কমেন্ট করে জানাবে।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x