গল্প:অন্তরের স্পর্শ(০৫)

লেখিকা:আয়াত বিনতে নূর

পর্ব:০৫



🚫অনুমতি ছাড়া দয়া করে কপি করবেন না🚫
বেশি বেশি রেসপন্স করবেন🤍🤍


রিহানের বাইক এসে থামে শেখ বাড়ির বিশাল লোহার গেটের সামনে। ব্রেকের শব্দে চারপাশের নীরবতা খানিকটা কেঁপে ওঠে। বাইকের পেছনে বসে থাকা তানভীকা তখনও অন্যমনস্ক—চোখ দুটো শূন্যে স্থির, যেন অনেক দূরের কোনো চিন্তায় আটকে আছে।

রিহান হালকা বিরক্ত কণ্ঠে বলল—
“কি রে তানভী, নামবি না? এইভাবে বসেই থাকবি নাকি?”

হঠাৎ করেই তানভীকার ধ্যান ভাঙে। যেন বাস্তবে ফিরে আসে সে। এক মুহূর্ত থমকে থেকে কী যেন ভাবলো, তারপর ধীরে ধীরে বাইক থেকে নেমে দাঁড়াল। মুখে কোনো কথা নেই, চোখেমুখে অদ্ভুত এক অস্থিরতা। কিছু না বলেই সে গেট পেরিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ল।

ড্রয়িংরুমের সোফায় তখন সালমা শেখ আধশোয়া ভঙ্গিতে বসে ফোন স্ক্রল করছিলেন। দামি শাড়ি, ভারী গয়না—সব মিলিয়ে চোখে পড়ার মতো উপস্থিতি। তানভীকাকে ঘরে ঢুকতে দেখেই তিনি ফোন থেকে চোখ না তুলে ব্যঙ্গভরা কণ্ঠে বলে উঠলেন—
“কই গো মালিহা? দেখো তো, তোমার মহারাণী এসে গেছে!”

কথাগুলো তানভীকার কানে গেলেও সে না শোনার ভান করল। একবারও সালমা শেখের দিকে তাকালো না। চুপচাপ পাশ কাটিয়ে সামনে এগিয়ে গেল।

ঠিক তখনই রান্নাঘর থেকে বের হয়ে এলেন মালিহা শেখ। শাড়ির আঁচলটা ঠিক করতে করতে এগিয়ে এসে তানভীকার কাছে পৌঁছে গেলেন। মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়েই যেন বুঝে ফেললেন, আজ সে স্বাভাবিক নেই। 

মায়াভরা চোখে তাকিয়ে দুটো হাত ধরে নরম গলায় বললেন—
“আয় মা, খেতে বস। সকাল থেকে তো কিছুই ঠিকমতো খাসনি। আগে খেয়ে নে, তারপর ফ্রেশ হ।”

তানভীকা কিছু বলার আগেই মালিহা শেখ তাকে আলতো করে টানতে টানতে ডাইনিং টেবিলের দিকে নিয়ে গিয়ে বসালেন। প্লেটে ভাত তুলতে যাবেন—ঠিক তখনই তানভীকা হঠাৎ উঠে দাঁড়ালো।
এ দেখে মালিহা শেখ অবাক হয়ে বললেন—
“কি হলো মা? হঠাৎ উঠে পড়লি কেন?”

তানভীকা এক মুহূর্ত চুপ করে থাকলো। তারপর ঠোঁটের কোণে কৃত্রিম একটুখানি হাসি এনে বলল—
“আম্মু, আমার একটু মাথা ব্যথা করছে। আমি আগে ফ্রেশ হয়ে একটু রেস্ট নেবো। খেতে ইচ্ছে করছে না এখন।”

মালিহা শেখ কিছু বলার আগেই তানভীকা তাড়াহুড়ো করে সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালো। এক মুহূর্তের মধ্যেই সে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল, যেন আর এক সেকেন্ডও নিচে থাকতে চায় না।
মালিহা শেখ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।

 চোখ দুটো তানভীকার যাওয়ার পথের দিকেই আটকে রইলো। বুকের ভেতর অজানা এক শঙ্কা দানা বাঁধে—আজ মেয়েটা যেন কেমন আলাদা।
আর উপরের ঘরে উঠে দরজা বন্ধ করার আগমুহূর্তে তানভীকা নিজেই জানে না—আজ শেখ বাড়িতে ঠিক কে এসেছে, কিংবা সেই আগমন তার জীবনটাকে কোন অজানা মোড়ে ঠেলে দিতে যাচ্ছে।
-----------
কিন্তু আসল কথা কী যেনো—আজ তানভীকার মনটা একদমই ভালো নেই। কোনো নির্দিষ্ট কারণ নেই, তবু বুকের ভেতরটা যেন ভারী হয়ে আছে। অজানা একটা অস্বস্তি, যেটা সে নিজেও ঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে না।

সে সোজা নিজের রুমে চলে এসে দরজাটা ভেতর থেকে আটকে দিলো। বাইরের পৃথিবী থেকে নিজেকে আলাদা করে নিতে চাইল আজ। ক্লজেট খুলে একটা হালকা রঙের জামা বের করলো, সঙ্গে টাওয়াল। তারপর নিঃশব্দে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়লো।

বেশ অনেকক্ষণ ধরে শাওয়ার নিলো তানভীকা। যেন গরম পানির নিচে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিজের ভেতরের সব ক্লান্তি, দুঃখ আর অজানা ভয় ধুয়ে ফেলতে চাইছে। সময়ের হিসেব তার নিজের কাছেই নেই। যখন বেরিয়ে এলো, তখন ফর্সা মুখটা আরও ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।

 ঠোঁট দুটো কেমন নিষ্প্রভ, চোখের নিচে হালকা কালচে ছাপ।আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হাঁটু ছাড়িয়ে পড়া লম্বা চুলগুলো হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে শুকাতে লাগলো সে। গরম বাতাসে চুল উড়ছে, কিন্তু তানভীকার চোখ দুটো আয়নার ভেতর নিজের দিকেই স্থির—সেই চোখে কোনো আনন্দ নেই, নেই কোনো কৌতূহল। শুধু একরাশ অবসাদ।

চুল শুকিয়ে শেষ হলে ধীরে এসে বেডে বসল সে। ঠিক তখনই ফোনটা বেজে উঠলো। স্ক্রিনে চোখ রাখতেই দেখলো—তিয়াশা কল করেছে।
একটু দেরি করে কলটা রিসিভ করলো তানভীকা।

তিয়াশা ওপাশ থেকে বলল—
“কি রে তানভী, বাসায় পৌঁছেছিস?”

তানভীকা ক্লান্ত গলায় উত্তর দিলো—
“হ্যাঁ রে, একটু আগেই এসে পৌঁছালাম।”

তিয়াসা আবার জিজ্ঞেস করলো—
“টিউশনি করতে গেছিলি আজ?”

তানভীকা এক মুহূর্ত চুপ থেকে বলল—
“নাহ রে। রিহান ভাইয়া আমাকে বলেছেন আর পড়াতে যাওয়া লাগবে না। আমি যেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তিনি যেতে দেননি।”

কথাগুলো বলার সময় তার কণ্ঠে চাপা একটা অভিমান লুকিয়ে ছিল, যেটা তিয়াশা হয়তো বুঝতেও পারলো না।

তারপর তানভীকা নিজেই বলল—
“আচ্ছা, কালকে ভার্সিটিতে দেখা হবে। এখন একটু রেস্ট নেবো। রাখলাম।”

তিয়াশা শুধু বলল—
“আচ্ছা।”

আর সঙ্গে সঙ্গেই কলটা কেটে গেল।
ফোনটা পাশে রেখে তানভীকা বেডে নিজের শরীরটা এলিয়ে দিলো। মাথার ভেতর চিন্তার ভিড়, তবু চোখ দুটো আপনাতেই ভারী হয়ে এলো। না চাইতেই একটু পর ঘুমিয়ে পড়লো সে—একটা গভীর, নিঃশব্দ ঘুম।

******

এদিকে নিচে মালিহা শেখ নিজের হাতে খাবার বেড়ে নিলেন। মেয়েটা কিছু না খেয়েই উপরে চলে গেছে—এই চিন্তায় মনটা কেমন অস্থির হয়ে ছিল তার। প্লেট হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে তানভীকার রুমের সামনে এসে দরজায় হালকা নক করলেন। কোনো সাড়া না পেয়ে আস্তে করে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলেন।

ঢুকেই দেখলেন—তানভীকা ঘুমিয়ে আছে। শান্ত মুখ, নিস্তব্ধ শরীর। মালিহা শেখ নিঃশব্দে টেবিলের উপর প্লেটটা রেখে বেডের পাশে এসে বসলেন। মায়ের চোখে তখন গভীর মমতা আর চাপা কষ্ট।
আস্তে করে মেয়ের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে ফিসফিস করে বললেন—
“তুই ভালো আছিস তো মা? জানিস, তোর জন্য আমার আর তোর বাবার কতটা চিন্তা হয়…”

একটু থেমে গলা ধরে এলো তার। তারপর আবার বললেন—
“এইবার রিদওয়ান যখন দেশে ফিরেছে , এখন ওর সাথে তোর ডিভোর্সটা করিয়ে নেবো। তখন বাড়ির কেউ আর তোকে ঘৃণা করার সুযোগ পাবে না।”

চোখের কোণে পানি জমে উঠলো মালিহা শেখের। তবু কথা থামালেন না—
“আজ থেকে তেরো বছর আগে যা হয়েছিলো, এতে তো তোর কোনো দোষই ছিলো না মা। তবু কেন যে সবাই তোকে দোষারোপ করে—আমি কোনোদিন বুঝতে পারিনি।”

এই কথাগুলো বলে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। তানভীকার গায়ে আলতো করে চাদরটা টেনে দিলেন, এসির পাওয়ার কমিয়ে দিলেন যেন ঠান্ডা না লাগে। তারপর টেবিল থেকে প্লেটটা তুলে নিয়ে নিঃশব্দে দরজার দিকে এগোলেন।

রুমের দরজাটা বন্ধ করার আগে একবার পেছন ফিরে তাকালেন মেয়ের দিকে—ঘুমন্ত তানভীকা তখনও জানে না, তার জীবনের পুরনো ক্ষতগুলো আবার নতুন করে আলোচনায় আসতে যাচ্ছে, আর সামনে অপেক্ষা করছে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।

*****-*****

দেখতে দেখতে রাত সাড়ে নয়টা বেজে গেল। চারপাশে নেমে এসেছে গভীর নীরবতা, শুধু দূরে কোথাও গাড়ির শব্দ আর হালকা বাতাসের সোঁ সোঁ আওয়াজ। রিদওয়ান ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে নিজের রুমের বেলকনিতে এসে দাঁড়ালো। বেলকনির রেলিংয়ে ভর দিয়ে দূরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইলো সে। 

চোখ দুটো স্থির, কিন্তু মাথার ভেতর চিন্তার ভিড়—অনেক কিছু ভাবছে, অনেক হিসেব মেলাচ্ছে।
ঠিক সেই সময় ফোনটা বেজে উঠলো। স্ক্রিনে চোখ পড়তেই রিদওয়ানের ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠলো। ছোটবেলার বন্ধু রাফসানের কল।
হালকা হাসি নিয়েই কলটা রিসিভ করলো রিদওয়ান।
ওপাশ থেকে রাফসান হাসি-ঠাট্টা মেশানো কণ্ঠে বলে উঠলো—
“কি রে সালা? আমাদের ভুলে গেছিস নাকি? আমাদের সাথে একবার দেখা না করেই এভাবে বাড়িতে চলে গেলি! পারলি তুই এটা করতে?”

রিদওয়ান বেলকনির রেলিংয়ে ভর দিয়ে একটু হাসলো, তারপর শান্ত গলায় বলল—
“আরে আরে, এত রাগ করিস না। আমার একটু কাজ ছিল রে। তাই তাড়াতাড়ি চলে আসতে হয়েছে।”

একটু থেমে আবার বলল—
“একটু পরে বের হবো। আসলে ভাবছি এখানেই হেড অফিসটা খুলবো। কানাডায় আর ফিরবো না। এসব ব্যবস্থা করতেই ব্যস্ত ছিলাম, তাই তোদের সাথে দেখা করার সুযোগই হলো না।”

রাফসান হেসে উঠলো—
“কি করবি এত টাকা দিয়ে? বিদেশে পাড়ি জমিয়ে তো বিলিয়নার হয়ে গেছিস!”

রিদওয়ান শুধু হালকা হেসে বিষয়টা এড়িয়ে গেল। কিছু না বললেও সেই হাসির ভেতর অনেক গল্প লুকিয়ে ছিল।
তারপর রাফসান কণ্ঠটা একটু 
সিরিয়াস করে বলল—
“আচ্ছা, দেখা কি হয়েছে? যার জন্য আমাদের সাথে দেখা না করেই চলে এলি?”

এই প্রশ্নে রিদওয়ান একটু চুপ করে গেল। গভীর একটা শ্বাস ছাড়লো সে। তারপর
 ধীরে ধীরে বলল—
“নাহ… এখনো সামনাসামনি হয়নি।”

একটু থেমে আবারও বলল —
“তোরা লোকেশন পাঠিয়ে দে। আমি একটু পরেই আসছি।”

এই বলে কলটা কেটে দিল রিদওয়ান। ফোনটা পাশে রেখে আবার একবার অন্ধকারের দিকে তাকালো সে। তারপর খাওয়ার উদ্দেশ্যে রুম থেকে বের হয়ে পড়লো।

সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতেই দেখলো তাহমিনা শেখ উপরের দিকে আসছেন। ছেলেকে দেখেই মুখে স্বস্তির হাসি ফুটে উঠলো।
তিনি বললেন—
“আয় বাবা, খেতে আয়। তোকে ডাকতেই উপরে যাচ্ছিলাম।”

মায়ের কথায় রিদওয়ান হেসে বলল—
“তুমি কেন উপরে যাবে আম্মু? আমি তো নিজেই খেতে আসছিলাম।”

এই বলে দু’জন একসাথে নিচে নামলো। ডাইনিং টেবিলে আজ ঘরভর্তি মানুষ। রিদওয়ানের পছন্দের প্রায় সব খাবারই রান্না করা হয়েছে। টেবিলের ওপর খাবারের বাহার, কিন্তু রিদওয়ানের মন যেন অন্য কোথাও।

সে বসতেই চোখ দুটো অজান্তেই কাউকে খুঁজতে লাগলো। নিজেও বুঝতে পারলো না—কাকে খুঁজছে। রিদওয়ানকে দেখে রুবিনা হা করে তাকিয়ে রইলো। চোখের পলক ফেলতে ভুলে গেছে যেন। সেটা দেখে রিহান বিরক্ত
 গলায় বলে উঠলো—
“মুখটা বন্ধ কর। নাহলে মাছি ঢুকে যাবে মুখে।”
রুবিনা মুখ বন্ধ করে বিরক্ত হয়ে রিহানের দিকে তাকালো।

তারপর বলল—
“আমাকে নিয়ে ভাবতে হবে না ভাইয়া।”

রিহান ভ্রু কুঁচকে বলল—
“তোর থেকে বড় আমি। সম্মান দে, নাহলে কাল মুলে দেবো।”

এই কথায় রুবিনা মুখ বাঁকিয়ে আর কিছু না বলে চুপচাপ খাওয়ায় মন দিল।

তাহমিনা শেখ নিজের হাতে রান্না করা খাবার রিদওয়ানের প্লেটে বেড়ে দিলেন। মায়ের হাতের খাবারের প্রতি আলাদা একটা টান থাকলেও রিদওয়ান আজ কারো দিকে তাকাচ্ছে না। চুপচাপ খাওয়া শুরু করলো। ঠিক তখনই হঠাৎ করে সামিউল শেখ প্রশ্ন করলেন—
“মালিহা, আমার তানভীকা মা কোথায়? ও কি খাবে না?”

এই কথাটা শুনেই মালিহা শেখ মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেলেন। বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠলো। তিনি যে ভয়টা পাচ্ছিলেন, সেটাই হলো—রিদওয়ানের সামনে তানভীকার নামটা উঠেই গেল।

রিদওয়ান তানভীকার নাম শুনে হালকা একটা হাসি দিল। সেই হাসির অর্থ কেউ বুঝলো না। সে আর কিছু না বলে কয়েক গাল খেয়ে হাত ধুয়ে নিল।

তারপর তাহমিনা শেখের দিকে তাকিয়ে বলল—
“আমার খাওয়া হয়ে গেছে আম্মু। আমি একটু বাইরে যাচ্ছি। ফিরতে রাত হবে।”

তাহমিনা শেখ কিছু বলার আগেই রিদওয়ান চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। আর এক মুহূর্ত দেরি না করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।

ডাইনিং রুমে হঠাৎ করে নেমে এলো এক অদ্ভুত নীরবতা। কেউ বুঝতেও পারলো না—এই রাত, এই নাম আর এই অপ্রস্তুত হাসি—সব মিলিয়ে সামনে ঠিক কী ঝড় বয়ে আনতে যাচ্ছে।

******

তাহমিনা শেখ সামিউল শেখের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন—
“এবার খুশি হয়েছো তো, সামিউল? আমার ছেলেটা না খেয়েই বাইরে চলে গেলো। কেন নিলে ওই নামটা? কেন ওই অপয়া মেয়েটার কথা তুললে? ওর জন্যই আজ আমার ছেলেটা না খেয়ে বেরিয়ে গেল।”

কথার তীব্রতায় ডাইনিং রুমের বাতাস ভারী হয়ে উঠলো।

রফিউল শেখ বিরক্ত কণ্ঠে বলে উঠলেন—
“কি হচ্ছে এসব, তাহমিনা? মুখ সামলে কথা বলো। কাকে কী বলছো তুমি?”

কিন্তু তাহমিনা শেখ আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। চিৎকার করে উঠলেন—
“হ্যাঁ, ঠিকই বলছি। ওই অপয়াটার জন্যই আজ আমার ছেলের এই অবস্থা। ওর নাম শুনলেই আমার ছেলের মুখ বদলে যায়!”

এইবার সামিউল শেখ আর সহ্য করতে পারলেন না। চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়িয়ে গলা উঁচু করে বললেন—
“মুখ সামলে কথা বলো, ভাবি। কাকে তুমি অপয়া বলছো? ভুলে যেয়ো না—সন্তান শুধু তোমার একার না। আজ যদি তোমার ছেলেকে কেউ এভাবে অপমান করতো, তোমার কেমন লাগতো?”

একটু থেমে, ভারী কণ্ঠে বললেন—
“অভ্যাসের বশে বলে ফেলছো, কিন্তু ভেবেছো একবারও? আর তোমার ছেলে এখন আর ছোট নেই। সে কি অবুঝ? আজ না হোক কাল তো ওরা মুখোমুখি হবেই। তখন কী করবে তুমি, ভাবি?”

কথার তীব্রতা আরও বেড়ে গেল।
“আর হ্যাঁ,”

সামিউল শেখ দৃঢ় কণ্ঠে বললেন—
“যদি তোমাদের আমার মেয়েকে নিয়ে সমস্যা থাকে, তাহলে আমরা আমাদের মেয়েকে নিয়ে এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাবো। আর যেহেতু রিদওয়ান দেশে এসেছে, এবার তানভীকা আর রিদওয়ানের ডিভোর্সটা করিয়ে নেওয়াই ভালো। কালই আমি এই বিষয়ে রিদওয়ানের সাথে কথা বলবো। এখন আশা করি সবাই খুশি?”

ঘরে নেমে এলো নিস্তব্ধতা। কেউ আর কোনো কথা বলার সাহস পেল না। 

রফিউল শেখ ভারী মন নিয়ে মালিহা শেখের দিকে তাকিয়ে বললেন—
“যাও তো মালিহা, তানভীকা মা-কে ডেকে আনো। মেয়েটা কিছুই খায়নি। একটু খেয়াল রাখবে।”

মালিহা শেখ চোখের পানি মুছতে মুছতে নরম গলায় বললেন—
“এক্ষুনি যাচ্ছি ভাইজান।”

এই বলে তিনি দ্রুত তানভীকার রুমের দিকে চলে গেলেন। রফিউল শেখ তানভীকাকে অসম্ভব ভালোবাসেন। তার কাছে তানভীকা শুধু ভাইয়ের মেয়ে নয়—সে তার বাবার রেখে যাওয়া সবচেয়ে সুন্দর একটা সম্পদ।

 নিজের ছেলের থেকেও তানভীকাকে তিনি বেশি আদর করেন। আর এই কারণেই সামলা শেখ আর মিজান শেখ কখনোই তানভীকাকে সহ্য করতে পারে না। তার উপর তানভীকার অতিরিক্ত সৌন্দর্য—সেটা সামলা শেখ আর রুবিনার চোখে আরও বেশি জ্বালা ধরায়। অথচ এইসব কিছুর জন্য মেয়েটার কোনো দোষই নেই।

এদিকে মালিহা শেখ তানভীকার রুমে ঢুকে দেখলেন—তানভীকা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
বেডের পাশে বসে আলতো গলায় ডাকলেন—
“তানভী মা, উঠ। দেখ, রাত দশটা বেজে গেছে। সারাদিন কিছু খাসনি।”

তানভীকা একটু নড়েচড়ে আবার ঘুমিয়ে রইলো।
মালিহা শেখ মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে মায়াভরা কণ্ঠে বললেন—
“উঠ মা… একটু খেয়ে এসে আবার ঘুমাস।”

এইবার তানভীকা ধীরে ধীরে চোখ খুললো। ক্লান্ত চোখে তাকিয়ে শুয়ে থাকা অবস্থা থেকে উঠে বসল।
মালিহা শেখ বললেন—
“ফ্রেশ হয়ে নিচে আয় মা। কিছু খেয়ে তারপর ঘুমাবি।”

তানভীকা ছোট করে বলল—
“আচ্ছা আম্মু।”

সে ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হলো। বেরিয়ে এসে নিজের লম্বা, সিল্কি চুলগুলো ক্লিপ দিয়ে সুন্দর করে খোপা করে নিলো। মাথায় উড়না টেনে নিয়ে ধীরে ধীরে নিচে নামলো।

নিচে এসে দেখলো—সবার খাওয়া প্রায় শেষ। টেবিলে শুধু ফাহিম খেতে বসেছে। পাশে বসে আছেন রফিউল শেখ আর সামিউল শেখ।
রুবিনা হাত ধুয়ে উপরে যাওয়ার সময় তানভীকাকে দেখে মুখ ঘুরিয়ে নিলো।
তানভীকা এসব গায়ে না মেখে চুপচাপ ফাহিমের পাশের চেয়ারে গিয়ে বসল।

মালিহা শেখ তানভীকার প্লেটে খাবার বেড়ে দিয়ে বললেন—
“নে মা, খাওয়া শুরু কর।”

তানভীকা মাথা নেড়ে খাওয়া শুরু করলো।
রফিউল শেখ স্নেহভরা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন—
“পড়াশোনা কেমন চলছে আম্মু?”

তানভীকা মাথা নেড়ে বলল—
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো, বড় আব্বু।”

সামিউল শেখ বললেন—
“তানভীকা মা, তোমাকে আর টিউশনি করাতে যেতে হবে না। পড়াশোনার এমনিতেই অনেক চাপ, তার ওপর এসবের দরকার নেই।”

তানভীকা কিছু বলতে যাবে—ঠিক তখনই রফিউল শেখ বললেন—
“দেখো আম্মু, বিষয়টা এমন না যে তুমি আমাদের কাছ থেকে টাকা নিচ্ছো। বাবা মারা যাওয়ার আগে তোমার নামে ৩০% সম্পত্তি লিখে দিয়ে গেছেন। তাহলে দ্বিধা কিসের? আর বাকি ৭০%—”
কথা শেষ না করেই থেমে গেলেন তিনি।

তানভীকা বুঝে গেলেন—রফিউল শেখ কী বলতে চান। 

সে খাওয়া থামিয়ে শান্ত গলায় বলল—
“বাকি ৭০% আপনার বড় ছেলের, বড় আব্বু। আমার না। আর এসব কিছুই আমি চাই না। আমার নিজের যা আছে, তা নিয়েই আমি ভালো আছি। তাহলে এসবের দরকার কী?”

মেয়ের কথা শুনে  সামিউল শেখ মৃদু 
হেসে বললেন—
“দরকার আছে তানভীকা মা। আচ্ছা, ওখান থেকে কিছু নিতে হবে না। কিন্তু তোর বাবা তো বেঁচে আছে—তার থেকেই নিবি। বড় হয়ে আমাদের দায়িত্ব নিবি। তাহলেই তো হবে। নাকি আমাদের ভুলে যাবি?”

তানভীকা সঙ্গে সঙ্গে বলল—
“কি যে বলো আব্বু!”

সামিউল শেখ হেসে উঠলেন—
“আচ্ছা, তাহলে কাল থেকে আর টিউশনি করতে যাবি না। যখন যা লাগবে, শুধু তোর এই আব্বুকে বলবি। তাহলেই হবে।”

তানভীকা ধীরে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো।
ঘরের ভেতর তখনও অনেক অজানা কথা, অদেখা দ্বন্দ্ব আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ চুপচাপ অপেক্ষা করে রইলো।

এরপর একে একে সবাই খাওয়া শেষ করে ধীরে ধীরে নিজেদের নিজের রুমে চলে গেলো। ডাইনিং রুমটা অল্প সময়ের মধ্যেই ফাঁকা হয়ে গেল, শুধু টেবিলের ওপর রাখা থালা–বাসন আর নীরবতা পড়ে রইলো।

***
এদিকে তানভীকা যেহেতু সন্ধ্যায় একটু ঘুমিয়ে নিয়েছিল, তাই এখন তার ঘুম আর আসছিল না। রুমে ফিরে এসে সে ব্যাগ খুলে বই–খাতা বের করলো। বেডের পাশে টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে মন দিয়ে পড়তে বসে গেল। পাতার পর পাতা উল্টাতে উল্টাতে মাঝেমধ্যে থেমে যেত—কখনো কোনো লাইন চোখে পড়তো না, কখনো মাথার ভেতর অজান্তেই অন্য চিন্তা ঢুকে পড়তো। 

তবু নিজেকে জোর করে মনোযোগী রাখার চেষ্টা করলো।বেশ কিছুক্ষণ পর পড়া শেষ করে বইগুলো গুছিয়ে রাখলো তানভীকা। তারপর উঠে গিয়ে ফ্রেশ হলো। মুখে ঠান্ডা পানি দিতেই একটু স্বস্তি লাগলো। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একবার নিজের দিকে তাকালো—চোখে ক্লান্তি, তবু মুখে এক ধরনের স্থিরতা।

সবশেষে লাইট বন্ধ করে বেডে শুয়ে পড়লো সে। চাদর টেনে চোখ বন্ধ করতেই ধীরে ধীরে ঘুম নেমে এলো। রাতের নিস্তব্ধতার মাঝে তানভীকা আবার ঘুমিয়ে পড়লো—আগামী দিনের অজানা গল্পগুলো বুকে নিয়ে।

চলবে......



নোট: নতুন গল্পে রেসপন্স এত কম কেন? এইভাবে চলতে থাকলে কোন গল্প এই দিব না। সবাই দয়া করে
বেশি বেশি রেসপন্স করবেন। 🫶🫶🫶
0 0 votes
Article Rating
Loading spinner
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x