লেখিকা-জান্নাতুল ফারিয়া প্রত্যাশা
১২.
~
কান্নারত অবস্থাতেই হঠাৎ তনিমার মনে হলো সে যেন শূন্যে ভাসছে। ভয়ে আতকে উঠে চিৎকার দিতেই ফায়াজকে দেখে চুপ হয়ে গেল সে। ভয়ে বুকটা ধুরুধুরু করছে তার। তনিমার ভয় মাখানো মুখটা দেখে ফায়াজ দাঁত কেলিয়ে হাসল। বললো,
‘কিরে, ভয়ে তো দেখি কান্না করে দিয়েছিস? ভীতুর ডিম একটা।’
কথাটা বলেই ফায়াজ হাসতে আরাম্ভ করে। তনিমা এবার তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে। একে তো তাকে ফেলে রেখে চলে গিয়েছিল, এখন আবার এসেছে মজা নিতে। তনিমা রাগে ফায়াজকে এলোপাথারি কিল ঘুষি মারতে থাকে। ফায়াজ তখন হাসতে হাসতে বলে,
‘ওও কামন বেবি, তোমার এই নরম নরম হাতের ঘুষিতে আমার কিছুই হবে না? আমার এই বিশাল শরীরের মাঝে তোমার এই হালকা পাতলা ঘুষি কিছুই না, বুঝেছো?’
তনু রাগে চোখ মুখ কুঁচকে ফেলল। তারপর চেঁচিয়ে উঠে বললো,
‘আমি না চাইলে এক্ষুনি তোকে মেরে ফেলতে পারতাম। কিন্তু কেন পারছি না জানিস, কারণ তোকে মারলে তো আমি বিধবা হয়ে যাবো। আমার এত তাড়াতাড়ি বিধবা হওয়ার কোনো শখ নেই। তাই তোকে বাঁচিয়ে রেখেছি। নয়তো এতক্ষণে তোর কেল্লা ফতে হয়ে যেত।’
ফায়াজ ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বললো,
‘হয়েছে হয়েছে, আমাকে মারার স্বপ্ন মাথা থেকে বাদ দে। যেই না শক্তি আবার আসছে আমাকে মারার হুমকি দিতে। তোর নিজের জীবনই তো এই মুহূর্তে রিস্কে আছে, তুই এসেছিস কিনা আমাকে থ্রেড দিতে। হাউ ফুল!’
তনিমা ব্রু কুঁচকে বললো,
‘আমার জীবন হুমকিতে মানে?’
ফায়াজ বাঁকা হেসে তার হাতের বাঁধনটা আলগা করতেই তনিমা ভয়ে ফায়াজের গলা ঝাপটে জড়িয়ে ধরলো। ফায়াজ তখন ব্রু নাচিয়ে বললো,
‘এবার বুঝেছিস তো, তোর জীবন কি পরিমান হুমকিতে আছে? এক কথায় বলতে পারিস তোর জীবন মরণ এখন আমার হাতে।’
কথাটা বলেই ফায়াজ রূপকথার গল্পের রাক্ষসগুলোর মতো হু হা করে হাসতে লাগল। তনিমা চোখ উল্টে ফায়াজকে ভেংচি কাটল। তারপর বললো,
‘হয়েছে ভ্যাটকানো বন্ধ কর। আর আমাকে কোল থেকে নামা। আমি কোনো বাচ্চা না যে আমাকে কোলে নিয়ে বসে থাকতে হবে।’
ফায়াজ হাসি থামিয়ে তনিমার দিকে গভীর মনোযোগে তাকাল। তারপর একটু অন্যরকম কন্ঠে বললো,
‘তুই আমার বউ হোস। আমার যখন খুশি আমি তখন তোকে কোলে নিব। খবরদার কিছু বলেছিস তো!’
তনিমা থম মেরে চেয়ে রইল ফায়াজের চোখের দিকে। ফায়াজ আলতো হেসে মোলায়েম কন্ঠে বললো,
‘তোকে না আজ একটু অন্যরকম লাগছে।’
তনিমা অবাক কন্ঠে জিগ্যেস করলো,
‘কি রকম?’
থমকে যাওয়া কন্ঠস্বরে ফায়াজ বললো,
‘অন্যদিনের তুলনায় একটু বেশিই মোহনীয় লাগছে। সেদিন রাতে যখন বৃষ্টিতে ভিজেছিলি সেদিনও তোকে ঠিক এমনই লাগছিল। ভীষণ মোহনীয়।’
তনিমা হঠাৎ খেয়াল করে তার হার্টবিট বেড়ে গিয়েছে। তনিমার আধভেজা শরীর ফায়াজের শরীরের সাথে মিশে আছে। ফায়াজের বুকের ধুকধুকানি টাও যেন তনিমা শুনতে পাচ্ছে। ফায়াজের হৃদয়টাও কি তার মতোই অস্থির হয়ে উঠেছে? হয়তো, নয়তো তার কম্পনের শব্দ তনিমার কর্ণগোচর হতো না। তনিমা আলতো করে তার মাথাটা ফায়াজের বুকের সাথে ঠেকালো। তারপর মৃদু সুরে বললো,
‘বাসায় চল।’
.
বাসায় এসেই তনিমা সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ল। আর ফায়াজ এক গাদা ব্যাগ হাতে ভেজা শরীর নিয়ে বসে রইল বেশ কিছুক্ষণ। ওয়াশরুম থেকে তনিমা বের হতেই ফায়াজ তাকে রাগি লুক মেরে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ল। তনিমা তখন ভেংচি কেটে আয়ানার সামনে দাঁড়াল চুল মুছবার জন্য। এর মাঝেই ফিহা এল তাদের রুমে। রুমে এসেই সে অভিমানের সুরে বলে উঠল,
‘এটা তুমি মোটেও ঠিক করনি ভাবি?’
তনিমা চুল মোছা বন্ধ করে প্রশ্নসুলভ দৃষ্টিতে ফিহার দিকে তাকিয়ে বললো,
‘কি ঠিক করেনি?’
ফিহা ঠোঁট উল্টে কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বললো,
‘এই যে তোমরা আমাকে ছাড়া কত ঘুরাঘুরি করে আসলে। নিশ্চয়ই অনেক জায়গায় ঘুরেছো? তাই এত লেইট হয়েছে, তাই না? আর কি খেয়েছো বাইরে থেকে? ফুচকা না চটপটি কোনটা?’
তনিমা ফিহার পাশে বসলো। তারপর আলতো হেসে বললো,
‘আমরা কোত্থাও ঘুরিনি রে বাবা। শপিং করতেই এত সময় লেগেছে। আর তার উপর এই বৃষ্টির কারণে আটকা পড়ে গিয়েছিলাম, তাই আরো লেইট হয়েছে। আর বাইরে থেকে কিছুই খাইনি। এখন খিদা লেগেছে প্রচুর। তোরা খেয়েছিস সবাই?’
‘হ্যাঁ, আমি আর তানভীর ভাই খেয়েছি। তবে আংকেল আন্টি খাননি। উনারা তোমাদের জন্য বসে ছিলেন। তোমরা আসলে নাকি একসাথে খাবেন।’
‘আচ্ছা, ঠিক আছে। তোর ভাইয়া ওয়াশরুম থেকে বের হোক, তারপর আমরা সবাই একসাথে খেতে বসবো। আর তুই এখন একটা কাজ কর, ঐ যে ব্যাগ গুলো দেখছিস ঐখানে অনেক সাবান শ্যাম্পু সহ আরো কিছু কসমেটিকস আছে। এইগুলো একটু আলাদা আলাদা ভাগ করে রাখ। পরে সবাইকে এইগুলো দেওয়া হবে।’
ফিহা মুচকি হেসে বললো,
‘আচ্ছা ঠিক আছে।’
.
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হতে চললো। ফায়াজ, তনিমা বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। দুপুরের খাওয়ার পর থেকেই তনিমার শরীরটা একটু বেশিই খারাপ লাগছিল। খাওয়া শেষেই এসে ঘুম দিয়েছে সে। ফায়াজও কিছুক্ষণ শুয়ে বসে থেকে যখন তার আর ভাল লাগছিল না তখন সেও তনিমার পাশে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।
মাগরিবের আযান হয়েছে অনেকক্ষন। তবে পশ্চিম আকাশে সূর্যের এখনো কিছু লাল আভা রয়েছে। বাইরে গুড়িগুড়ি বৃষ্টি পড়ছে। তারসাথে রয়েছে হালকা ঠান্ডা বাতাস। বর্ষার ভেজা আবহাওয়া একটু অন্যরকম। চারদিকে কেমন ধূসর ধূসর ভাব। কেমন নিরব, নিস্তব্ধ। থেকে থেকে কেবল একরাশ আষাঢ়ি কান্না শোনা যায়।
মাত্রই ঘুম ভেঙ্গেছে ফায়াজের। হাত মুখ ধুয়ে সে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। ততক্ষণে চারদিক অন্ধকার। বাইরের বৃষ্টি এখনও বহমান। ফায়াজ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে রুমে এলো। তারপর গিয়ে তনিমার পাশে বসলো। তনিমা এখনও ঘুমাচ্ছে। ফায়াজ চেয়ে আছে তার দিকে। তার ঘুমন্ত মুখটা মিষ্টি লাগছে। থুতনির উপর কালো তিলটা তার বেশ আকর্ষণীয়। ফায়াজ আলতো হাতে সেই তিলটার উপর হাত বুলাতেই সে চমকে উঠল। তারপর সে ব্যস্ত হয়ে তনিমার কপালে গলায় হাত দিয়ে দেখল, তনিমার শরীর অত্যদিক মাত্রায় গরম হয়ে আছে। ফায়াজ তখন অস্থির হয়ে তনিমাকে ডাকতে লাগল,
‘তনু! এই তনু! তোর শরীর তো জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। এই মেয়ে তাকা আমার দিকে।’
তনিমা খানিকটা নড়ে উঠল। পিটপিট করে তাকানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু সে যেন তাকাতে পারছে না। ফায়াজ আবারও বলতে লাগল,
‘তনু, তাকাতে পারছিস না তুই? কষ্ট হচ্ছে? হঠাৎ এত জ্বর হলো কি করে? এ-এই ব-বৃষ্টিতে ভেজার কারণে তাই না? ঐদিন একটু ভেজাতেই তোর ঠান্ডা লেগে গিয়েছিল। আজকে কি দরকার ছিল ভেজার? এখন বাধিয়েছিস তো জ্বরটা। ইশশ, গা টা পুড়ে যাচ্ছে।'(গলার নিচে হাত রেখে বললো)
তনিমা এবার ভালোমতো তাকাল। তারপর ক্লান্ত সুরে বললো,
‘আমার না খুব পানির পিপাসা লেগেছে, একটু পানি দিবি?’
‘দাঁড়া দিচ্ছি।’
ফায়াজ তনিমাকে ধরে আস্তে আস্তে উঠে বসালো। তারপর পানির গ্লাসটা এগিয়ে দিয়ে তাকে পানি খেতে বললো। তনিমা ঢকঢক করে পুরো পানিটা খেয়ে নিয়ে জোরে দম ফেলল। তার হাত পা কেমন যেন কাঁপছে। মাথাও ঘুরাচ্ছে। সে আর বসে থাকতে পারলো না। শুয়ে পড়ল। তারপর ফায়াজের দিকে তাকিয়ে বললো,
‘আমার খুব শীত করছে, ফায়াজ। ঐ আলমারিটা খুলে একটা কম্বল বের করে দেনা!’
ফায়াজ তনিমার কথা মতো আলমারি থেকে কম্বল বের করে তনিমা গায়ে দিয়ে দিল। কম্বলের ভেতর তনিমা বেশ জড়সড় হয়ে শুয়ে রইল। ফায়াজ অসহায় চোখে চেয়ে রইল তনিমার দিকে। তনিমার চোখ বুজা। নয়তো এই মুহুর্তে হয়তো ফায়াজের চোখের ভাষা পড়েই তনিমা বুঝে যেত ফায়াজ তাকে কতটা ভালোবাসে।
চলবে..