গল্প: স্থির নিশীথ(০৭)

লেখিকা:নাজনীন নাহার

part:07

 

জ্যোতি বাসা এসে দেখে অনেকের সমাগম। জ্যোতি বুঝতে পাড়ছে না আজ বাড়িতে কি কোনো অনুষ্ঠান আছে। কোই জ্যোতি জানে না সে বিষয় কিছু। ড্রইং রুমের দিকে এগোতেই দেখে তার মা আাসিয়া খান খুব হাসছে আর কথা বলছে। জ্যোতির পিছন থেকে একজন বলল

-‘ তুমি এখনও রেডি হওনি?’

জ্যোতি পিছন ফিরে দেখে আয়শা মির্জা.। জ্যোতি মনে মনে- ‘ওনি, এখানে, এখন, কেনো?’

জ্যোতিকের ভাবনার মাঝে জবা এসে ওর পাশে দাড়ায়। জ্যোতি ডান হাতটা ধরে

-‘ এখনই রেডি হয়ে যাবেও দাদিমা, আপনি বসুন।’

আয়শা মির্জা জ্যোতির গালে হাত দিয়ে বলে

-‘ খুব সুন্দর করে সাজবে আজ, আমার নাতি যেন চোখ সরাতে না পারে।’

বলে চলে গেলেন তিনি।গিয়ে তার ছেলে আশরাফ মির্জার পাশের বসে।

-‘ আরে বেয়ান, আপনার মেয়েকে আমার ছেলের বউ করবো এতে আমরা বেজায় খুশি।  আর মেয়েকে চল্লিশ বরি স্বর্ন দিয়ে একদম পরীর মতো করে নিয়ে যাবো।’

আসিয়া খান হেসে বলে -‘ আমরাও তো কিছু দিতে চাই কিন্তু এখন নয় কিছু দিন পরে আমার মেয়েই আপনার ছেলেকে দিবে।’

কথাটা খুব সহজ শোনালেও এর অর্থ অনেক গভীর। সে অর্থ সবার বোঝা কাম্য নয়।

আশরাফ মির্জা তার কথার প্রতিউওরে হাসে।

_________________________________________

-‘ শোন জ্যোতি এই বিয়েটা করা খুব দরকার। আমার কথাটা বোঝার চেষ্টা কর আমি যা করছি বুঝে শুনেই করছি তোর বা আমাদের ক্ষতি হবে এমন কিছু করছি না। আর বিয়েতো সবাইকেই করতে হবে হয় আজ না হয় কাল। তো আজই করেনে।’

জ্যোতি স্তব্ধ হয়ে বসে আছে খাটের এক কর্নারে। সে যা দেখছে আর শুনছে এগুলো কিছু আদৌও বাস্তব নাকি কল্পনা। না, এগুলে কল্পনা না সবই বাস্তব। জ্যোতি মৃদু স্বরে বলল

-‘ বিয়েটা করা কি খুব বেশি দরকার?’

তার কন্ঠে আছে অসহায়ত্বতা।  যে মানুষটাকে নিজের থেকেও বেশি বর্শা করতো সে এই কথা বলছে। জ্যোতির মনে হচ্ছে সে কোনো দুঃস্বপ্ন দেখছে এখনই কেউ এসে তাকে ধাক্কা দিয়ে বলবে ‘আর কতো ঘুমবি উঠ এবার।’ কিন্তু না আজ তেমন টা হলো না কেউ ডাকলো না তাকে জবা তার সামনে সেই আগের মতোই দাড়িয়ে আছে। জবার চোখের কোনে পানি টলমল করছে পড়তে পড়তেও পড়ে না এমন ভাবে।

-‘ হ্যাঁ, বিষন দরকার। আমাদের জন্য না হোক বাবার জন্য অন্তত বিয়েটা কর।’

জবার শেষ একটা কথাই যেন জ্যোতিতে রাজি করাতে সক্ষম। যে কাজ গুলো রাগ, জেদ, ক্ষমতার জোরে করা যান না সেগুলো আবেগকে অস্ত্র বানিয়ে হাসিল করা যায়। জবাও আজ তাই করলো সে জানে জ্যোতি বাবার বেপারে খুব অনুভূতিপ্রবণ।

.

-‘লাল পড়বো না।’

-‘বিয়েতে লাল পরতে হয় জ্যোতি।’

-‘হয় বলেই কি আমাকেও পড়তে হবে? আমি সাদা পরবো।’

জ্যোতি একপ্রকার জেদ নিয়েই কথাটা বললো। জবা বুঝে যায় জ্যোতি যখন বলছে তখন সেটাই করবে সে। সাদা শাড়ির অযুহাতের যদি বিয়েটাই না করে তাহলে কি হবে জবা সবার সামনে মুখ দেখাবে কিভাবে

-” আচ্ছা ঠিক আছে, তুই বস আমি এক্ষুনি আসছি।’

বলে চলে গেল জবা। ঠিক দশ মিনিট পরে জবা আসে হতে একটা ব্যাগ।

-‘ নে তো সাদা বেনারসি। নাও হ্যাপি?’

-‘নোপ’।

জ্যোতিকে খুব সুন্দর লাগছে আজ। বিয়ের সাজে মেয়েদরা নতুন রুপ ধারণ করে। সেটা আজ জ্যোতিকে দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু আশ্চর্যজনক বিষয় হচ্ছে জ্যোতি পড়েনি কোনো ভারি গহনা, না পড়েছে হাতে বালা আর না করেছে ভারি মেকআপ। খুব সাধারণ ভাবে অসাধারণ কিছু তুলে ধরছে। হুমায়ুন আহমেদের একটা কথা মনে পড়ে গেল ” বউ হিসেবে সবাই সাধারণ  মেয়ে খোঁজে”। তবে মেয়েরা সাধারনত লাল শাড়িতে শশুর বাড়িতে যায় আর তাদের নেয়াত থাকে সাদা শাড়িতে তারা যেন শশুর বাড়ি ত্যাগ করতে পাড়ে। কিন্তু জ্যোতি আজ শশুর বাড়ি যাবে সাদা শাড়ি পড়ে তাহলে কি সে বিপরীতে কিছু করতে চাইছে?

-‘কতো সুন্দর লাগছে তোকে জ্যোতি, একদম নতুন বউ বউ লাগছে।’

জ্যোতি কোনো কথা বলে না। আয়নায় পর্যবেক্ষণ করছে নিজেকে। আজ থেকে শুরু হবে তার জীবনের এক নতুন অধ্যায়, সে কি তার জন্য প্রস্তুত?

-‘ আয় তোকে একটা কালো টিকা দিয়ে দিই যেন নজর না লাগে।’

জবা হাত বারায় কালো টিকা দেওয়ার জন্য তৎক্ষনাৎ জ্যোতি উঠে ধারায়।

-‘দরকার নেই এসবের কোনো।’

জ্যোতি রুম থেকে বের হওয়া জন্য পা বাড়ালো তার সাথে জবাও আসছে। জবা এসে জ্যোতির একটি হাত ধরে বলে

-‘ একা একা বিয়ের আসরে গেলে মানুষ বলবে মেয়েটার লজ্জা নেই।’

-‘ ঠিকই বলবে, মেয়েটির তো খুব বেশি লজ্জা নেইও’।

জবা হেসে দেয় জ্যোতির কথা শুনে কিন্তু জ্যোতির মুখ অন্ধকার। জ্যোতি যেন এজগতে নেই সে তার চিন্তা জগতে হারিয়ে গেছে ‘এই বিয়েটা করা কি সঠিক সিদ্ধান্ত? নাকি ভুল?’

জ্যোতিকে সোফায় বসিয়ে দেয় জবা। জ্যোতি নিচের দিক না তাকিয়ে চারিদিকের মানুষদের দেখছে। ‘এদের কে তো ঠিক চিন্তে পারছি না এরা সবাই মির্জা পরিবারের সদস্য? আমি তো আশরাফ মির্জা আর তার মাকে ছাড়া কাউকেই চিনি না আরে না ওই যে মহিলাটা, ওনাকে দেখেছিলাম হসপিটালে আমার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল আর ওনার পাশের মহিলাকেও দেখেছিলাম হসপিটালে।’

জ্যোতির এসব ভাবনার মাঝে আয়শা মির্জা এসে জ্যোতি পাশে বসে।

– ‘ সে দিন শুধু নাতনি হয়েছিলে তাই আজকে নাতবউ বানাতে আসলাম।’

তাকে দেখে মনে হচ্ছে তিনি খুব খুশি এই বিয়েটার জন্য। মানুষ যখন খুশি থাকে সেটা তার হাসি দেখেই বোঝা যায়। তবে হাসি মানেই যে সে খুশি তা নয় অনেক হাসি আছে যে হাসিতে লুকিয়ে থাকে কিছু কষ্ট আর দুঃখ। জ্যোতি আয়শা মির্জার কথার উওরে শুধু হাসলো কিন্তু তার হাসিতে খুশি নেই দেখে বোঝা যাচ্ছে।

আশরাফ মির্জা তীক্ষ্ণ স্বরে কাউকে কারও সাথে কথা বলছে সেটা জ্যোতির চোখ এড়ালো না এসব ছোট খাটো বেপার অন্য কারো নজর এরালেও জ্যোতির নজর এরায় না।

বিয়ে হওয়ার কথা জহুরের নামাজের পর কিন্তু জহুর গরিয়ে  আসর হতে চল্লো কিন্তু এখনও পাএের কোনো খোঁজ নেই। আশরাফ মির্জা বার বার কল করছে, আশরাফ মির্জার ভাই পলাশ মির্জা তিনিও কাউকে কল করছে বার বার। পুরো পরিবেশটা যেন এলোমেলো হয়ে গেল।এরই মাঝে চলে আসে পাএ ঋভান আরশ মির্জা। বিয়ে করতে এসেছে নাকি অফিসের কোনো মিটিংয়ে এসেছে তাকে দেখে বোঝা মুশকিল। কালো প্যান্ট সাথে কালো শার্ট আর তার সাথে কালো ব্লেজার পড়ে এসেছে সে।

আশরাফ মির্জা ছেলের এইসব কর্মকাণ্ড ক্ষুন্ন হলো। তিনি ঋভানের দিকে এগিয়ে এসে বলে

– ‘ বিয়ে করতে এসেছো তুমি, কোনো মরা বাড়িতে নয়। এসব কেনো পড়ে এসেছো?’

-‘ অফিসে খুব ইম্পর্ট্যান্ট একটা মিটিং ছিল, সেখান থেকে সোজা এখানে আসলাম চেঞ্জ করার সময় পাইনি।’

আশরাফ মির্জা আর কোনো কথা বারায় না। এটা তর্ক করার সময় নয়। ঋভান এসে জ্যোতির মুখোমুখি বসে। আশরাফ মির্জা কাজীকে বলে বিয়ে পড়াতে।

কাজী সাহেব গলা খাঁকারি দিয়ে সামনে রাখা কাগজপত্র ঠিক করলেন।

“বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
আজকের এই শুভ দিনে আমরা একত্রিত হয়েছি দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের বৈধ বিবাহ সম্পন্ন করার জন্য। বিয়ে শুধু দু’টি মানুষের সম্পর্ক নয়, দু’টি পরিবারের বন্ধনও।”

তিনি চোখ তুলে একবার সবার দিকে তাকালেন।

“পাত্রের নাম— ঋভান আরশ মির্জা। পিতা— আশরাফ মির্জা। গুলশানের বাসিন্দা।
পাত্রীর নাম— অনন্যা নীরা জ্যোতি। পিতা— জামশেদ খান। ধানমন্ডির বাসিন্দা।”

এরপর তিনি দেনমোহরের কাগজ সামনে আনলেন।

-‘কনের জন্য নির্ধারিত দেনমোহরের পরিমাণ…
-‘কত টাকা লিখবো?’

আশরাফ মির্জা বলেন-‘বিশ লক্ষ টাকা। ‘

-‘কনের জন্য নির্ধারিত দেনমোহরের পরিমান বিশ লক্ষ টাকা। এই মোহর স্ত্রী’র প্রাপ্য অধিকার। উপস্থিত সাক্ষীদের সামনে এই পরিমাণ নির্ধারণ করা হলো।’

কাজী সাহেব সাক্ষীদের দিকে তাকালেন।

‘সাক্ষী হিসেবে যারা উপস্থিত আছেন, তারা কি এই বিবাহে সম্মতি প্রদান করছেন?’

দুইজন সাক্ষী একসাথে বললেন,

‘জি, সম্মতি দিচ্ছি।’

তারপর কাজী সাহেব ঋভানের দিকে তাকালেন। গম্ভীর অথচ শান্ত কণ্ঠে বললেন—

-‘জনাব ঋভান আরশ মির্জা, আপনি কি কনে অনন্যা নীরা জ্যোতিকে নির্ধারিত দেনমোহর ও শরিয়ত মোতাবেক নিজের স্ত্রী হিসেবে কবুল করছেন? তাহলে বলুন কবুল…’

-‘কবুল’

‘আরো দুইবার বলুন’

‘কবুল’

আরও একবার ধীর কণ্ঠে উচ্চারণ করলেন—

‘কবুল’

জ্যোতিকেও ঠিক এভাবে তিনবার কবুল বলে। হয়ে যায় তাদের মাঝে সম্পর্ক স্থাপন। যেন-তেন সম্পর্ক নয় স্বামী- স্রীর সম্পর্ক। আল্লাহর নির্ধারিত সম্পর্ক।

চলবে….

Loading spinner

Leave a Comment