priyo premer golpo

— ‘প্রেম করবেন প্রেম ভাই?’
কথাটা আমার আপন নাকউঁচু, অহংকারী, বদরাগী,ত্যাদড় চাচাতো ভাইয়ের উদেশ্যে আমার কণ্ঠনিঃসৃত হওয়া মাত্র প্রেম ভাইয়ের হাতটা আমাকে থাপ্পড় দেয়ার জন্য উঠে গেল। তবে মুহুর্তেই জায়গাটা থেকে সটকে পড়লাম আমি। আমার উপর বোধহয় উসাইন বোল্টের আত্মা ভর করেছিল তখন। আমার গতি পরিমাপের জন্য আলোকবর্ষ টপিকের প্রয়োজন। নয়তো আমাকে যদি ওনি একবার বাগে পেতেন তবে আমার পিন্ডি চটকে বার্গার, স্যান্ডউইচ সব বানিয়ে ফেলতেন। প্রেম ভাই চাচাতো বোনের কাছ থেকে হুট করে প্রেম প্রস্তাব পেয়ে তিনি জ্ঞান হারাতে পারেন। আবার পটলও তুলতে পারেন। আমি ভালো মেয়ে।আধবুড়ো লোক মে রে খুনের দায় নেব কেন? তাছাড়া প্রেম-ভালোবাসা নামক কোনো কাঁঠালের আঠায় জড়াতে চাইনি কোনোকালে। কিন্তু আমার বেয়াদব, বিচ্ছুর দল কাজিন নামক প্রাণীরা হুট করে ডেয়ার দিয়ে দিল।এখন ডেয়ার তো ডেয়ারই। ডেয়ার মানে দুঃসাহস। আর দুঃসাহস দেখানোর সর্বোত্তম উপায় নিজেকে বাঘের থাবার নিচে নিয়ে গিয়ে যোগ্যতার প্রমাণ করা! আর আমাদের বংশে বাঘ মানেই প্রেম ভাই। ওদের ধারণা আমার যোগ্যতা নাকি শুধুমাত্র প্রেমভাইকে প্রেম নিবেদনের মাধ্যমেই প্রমানিত হবে! হাহ। ওরা জানেনা একবার আমি কোনো কমিটমেন্ট করে ফেললে নিজেরও শুনিনা…হ্যাঁ,আচ্ছা ঠিক আছে। ওটা সালমান খানের ডায়লগ। তাতে কি? আমি তার ডায়লগ নিজের কাজে লাগাই। ডায়লগ তো দেয়ার জন্যই রিলিজ হয় তাইনা? আমিও ভালো মেয়ের মত ছেপে দিলাম। ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল আরও আগে। তবে আগুনের স্ফুলিঙ্গ ছড়ালো রোজার ঈদের আগে। আমরা বনেদী ব্যবসায়ী পরিবার। বহুকাল আগে দাদাভাই ঢাকায় কাপড়ের ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। দাদাভাইয়ের ব্যবসার উন্নতি হতেই গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় পাড়ি জমিয়েছেন। আল্লাহর রহমতে দাদাভাই কাপড়ের ব্যবসা থেকে গার্মেন্টস আর সেখান থেকে ব্যবসা আরও সম্প্রসারিত হয়েছে। আমার বাবা-চাচারা যুক্ত হয়েছেন ব্যবসায়। গুলশানে বিরাট বাড়ি বানিয়েছেন ছেলে-নাতিদের জন্য। স্থায়ীভাবে ঢাকায় বসবাস শুরু করলেও দাদাভাইয়ের নির্দেশ ঈদ অবশ্যই গ্রামে করতে হবে৷ যার দরুণ সারাবছর গ্রামের বাড়িতে ভুতের আনাগোনা লেগে থাকলেও ঈদের সময় ওদের আর জায়গা হয়না। আমরা এসে হৈচৈ করে ফিরে যায়। তারপর বোধহয় উনারা আবার ফিরে আসেন। এবারও ঈদে বাবা-মায়ের সঙ্গে দাদা বাড়ি এসেছিলাম। ব্যস সব বিচ্ছুগুলোর মাথা এক হলো আর বিচ্ছুরা এক হবে আর বিষদংশন হবেনা এটা তো হতে পারেনা! চাঁনরাতে মেহেদি লাগানোর ফাঁকে বোতল ফ্লিপ গেইমে হেরে ফাজিল গুলার যাতাকলে পড়েছিলাম আমি। আমাকে হারতে দেখে সে এক একজনের কি খুশি! এরা আমাকে ফাঁসিয়ে বোধহয় মজা পায় কিন্ত ফাজিল গুলোকে প্রতিবারই হারিয়ে দিই আমি। এবারও দিবই। নিজের প্রতি আমার অগাধ আস্থা-ভরসা। আমাকে হারতে দেখে সায়মা পারলে মাটিতে গড়াগড়ি দেয়।সায়মা আমাদের কাজিন গোষ্ঠীর সবচেয়ে সুন্দরী। কিন্তু সকলে ওর চেয়ে আমাকে গুরুত্ব দেয় বলে ও যে আমাকে নিয়ে জেলাস সেটা আমি বুঝি। ভালোমানুষির আড়ালে সে আমাকে হেয় করার তালে থাকে। অবশ্য আমি ওকে সুযোগ দিইনা। আমি সরু চোখে ওর দিয়ে তাকালাম। তাকিয়ে মুখটাকে বেশ গম্ভীর করে বললাম, — ‘এত যে দাঁত কেল্লাচ্ছিস? ফুফুকে বলে দিই সেদিন ফয়েজ লেকে বোটে কার সঙ্গে যেন প্যাডিং করলি?’
যদিও কথাটা পুরোটা আন্দাজের উপর বলেছিলাম কিন্তু এভাবে ফলে যাবে ভাবিনি। সায়মা থমকে গেল। গিয়ে সোজা হয়ে বসল। থমকে কিছুক্ষণ উথাল-পাতাল ভাবল। আমি জানি আমাকে কাঁদায় ফেলতে এত ব্রেইন খাটাচ্ছে। আমি আবার ঠেস দিয়ে বললাম, — ‘নে বাবা.. যত ইচ্ছে ব্রেইন খাটা। পড়াশোনায় তো আর ওটা ব্যবহার হয়না। বরং আমাকে ফাঁসাতেই না-হয় গোবরঠাসা ব্রেইনটা ইউজ হোক।’
ব্যস হেসে গড়াগড়ি খেল সবাই। তবে সায়মার মুখভঙ্গি বদলে গেল। বোতল ঘোরাতে ঘোরাতে সে-ই আমাকে ডেয়ার দিতে চাইল। বাকিরা অবশ্য সায় জানাল পুরোদমে। যেন আমাকে এবার কঠিন ডেয়ার দিয়ে ফাঁসিয়েই ছাড়বে। আমি চার আনা পাত্তা দিলাম না। আমাকে পাত্তা দিতে না দেখে বিচ্ছুগুলো ফের নড়েচড়ে বসল। সায়মা ততোধিক গম্ভীরতা নিয়ে বলল, — ‘ প্রেম ভাইকে প্রেমের প্রস্তাব দিবি । এটাই তোর ডেয়ার। ‘
ডেয়ার শুনে আমি চমকে ওঠলাম। প্রেম ভাইকে ফাসাতে হবে? তার নাম প্রেম হলেও নামের সঙ্গে তার কোনো মিল নেই। বরং নিজের প্রেম নামটা শুনলেই যেন ওনার গায়ে জ্বর আসে। সেই মানুষকে প্রেমের জালে ফাঁসাতে হবে? আমি মুখ ফসকে বলেই ফেললাম, — ‘এতো অসম্ভব!’
ব্যস অমনি বিচ্ছু গুলা সুযোগ পেল। অনন্ত জলিলের মত দুইচারটে লাফঝাপ দিয়ে বোঝাল অসম্ভবকে সম্ভব করায় নাকি আমার কাজ। আর আমি যদি ডেয়ার পূরণ করতে না পারি তাহলে যেন দাদাবাড়ীর পাশে সেই ধানক্ষেতটা আসে সেখানে সারারাত একা বসে থাকি! আমার ললাটে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। কিয়ৎক্ষণ থমকালাম। আমার অবস্থা তখন জলে বাঘ.. ডাঙায় কুমির! চিন্তায় প্রবাদ বাক্যটা অব্দি উলটো বললাম।এতে ওরা আরও পেয়ে বসল। ধানক্ষেতে বসে থাকা কি বাড়ির কাছের কথা? গ্রামের ক্ষেত-খামারে নাকি ‘তেনারা’ থাকেন। তেনারা মাঝরাতে গ্রামের রাস্তায় হাওয়া খেতে বের হোন। তখন মানুষের উপস্থিতি টের পেলে তেঁতুল গাছের মগডালে উঠিয়ে রেখে আসেন। আর যদি বেশি রেগে যান তবে ছুমন্তর করে ওনাদের দেশে নিয়ে খাঁচায় আটকে রাখেন! আমি একবিংশ শতাব্দীর জেনজি নারী। গ্রাম্য কথিত কুসংস্কারে ভয় পাইনা আমি এমনই আশ্বাস দিয়ে এগোলাম ধান ক্ষেতের দিকে দুরুদুরু বুকে। রাত-বিরেতে ফাঁকা ধানক্ষেতে বসে থাকার চেয়ে প্রেম ভাইকে প্রেমের জালে ফাঁসানো বোধহয় বেশি সহজ চারিদিকের অন্ধকার দেখে এটাও মাথায় এলো। একেবারে ইজি-পিজি-লেমন কুইজি টাইপ সহজ হবে। আমার দোলাচল, আড়ষ্টতা,আননে ফোটা ভয়ের ছাপ বোধহয় ওদের চোখেও ধরা পড়ল। আর পড়ল বলেই সকলে হৈহৈ করে উঠল। অবশেষে আমাকে এমন একটা ডেয়ার ওরা দিতে পেরেছে যেটা আমার দ্বারা পূরণ করা অসম্ভবই নয়, বরং কল্পানাতীত। প্রেম ভাই আমাদের কাজিন মহলে অত্যন্ত অহংকারী, বদরাগী হিসেবে পরিচিত। অবশ্য না হবার কারণ নেই। পরিবারে তিনিই একমাত্র বুয়েটের ছাত্র। নিয়মিত এডমিশন কোচিং-এর ক্লাস নেন। এই বয়সেই মাসে লাখ-লাখ টাকা ইনকাম করেন। বাবার ব্যবসায়ে এখন থেকেই নাক গলিয়ে সব বুঝে-শুনে নিচ্ছেন। নিজের যোগ্যতায় ইনকাম করা লাখ-লাখ টাকায় রোলাক্সের নিত্যনতুন ঘড়ি পড়েন। ব্র‍্যান্ড ছাড়া তো আন্ডারওয়্যারও পরেন না। এমনকি রাস্তার ধারে যেই স্যান্ডোগেঞ্জি বিশ টাকায় পাওয়া যায়, ওনি সেই গেঞ্জি শপিংমল থেকে পাঁচশ টাকা দিয়ে ব্র‍্যান্ডেরটা কিনে আনেন। ব্যবসায়ের পাশাপাশি এখন থেকেই আইইএলটিএস এর জন্য প্রিপারেশান নিচ্ছেন।আমাদের হাবিগোষ্ঠীতে ওনার মত মেধাবী কেউ নেই। কয়েক বছরের মধ্যে বিদেশে পাড়ি জমাবেন। চাঁদের মত উজ্জ্বল ভবিষ্যত ওনার। সবই জানা কথা। হাবিগোষ্ঠীর আমার মত ফেল্টুস সকলকে তিনবেলা নিয়ম করে তার কর্মের ফর্দ গেলানো হয়। যেকোনো ক্ষেত্রে তাকে উদাহরণ হিসেবে টানা হয়। সবার একটাই কথা প্রেমের মত হ-ও, প্রেমকে ফলো ক-রো, প্রেমের কাছে সাজেশন না-ও! যেখানে যা-ও সেখানেই প্রেম ভাইয়ের প্রেম সমাচার গলাধঃকরণ করানো হয় আমাদের। বাকিরা তাকে একটু-আধটু পছন্দ করলেও আমি তাকে দুচোখে সহ্য করতে পারিনা। আমার ধারণা আমার সম্পর্কেও তিনি একই ধারণা পোষণ করেন। আমাকে দেখলেই ওনার গায়ে যেন জ্বর আসে! অথবা ভাবেন আমার গায়ে কোনো ছোঁয়াচে রোগবালাই আছে। নয়তো আমাকে দেখামাত্রই ওনার লম্বা-লম্বা পা ফেলে সেই জায়গা থেকে পালিয়ে যান। একই বাড়িতে থাকি অথচ প্রেম ভাই আমাকে ইগ্নোর করেন পুরোদস্তুর। খাবার টেবিলে নিয়ম করে আমাদের দুইবেলা দেখা হয়। দুবেলা বলার কারণ দুপুরে ওনি বুয়েট ক্যাম্পাসে থাকেন। ইদানীং নাকি রাজনীতিতে সক্রিয় হচ্ছেন। ওনার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। দেশের একজন যোগ্য এমপি এমনকি কয়েক বছর পর মন্ত্রীত্ব পেয়ে যেতে পারেন! ওনি এমনভাবে আমাকে সবার সামনে ইগ্নোর করেন যেন আমি ওনার চোখের ভাইরাস। এমন অবশ্য আগে ছিল না। এই বছরখানেক আগে থেকে এসব কেচ্ছা-কাহিনী শুরু হয়েছে। আমি আগে ব্যপারটা খেয়াল করিনি। একদিন সন্ধ্যেবেলা চাচী ওনার জন্য কফি নিয়ে ঘরে পৌছে দেয়ার জন্য বললেন। বিকেলে বান্ধবীরা এসেছিল বলে বেশ সাজগোজও করেছিলাম। সাদা চুড়িদার, লাল সিল্কের ওড়না, খোলা চুল, কানে ঝুমকো পরে সারাবিকেল হাহাহিহি করলাম৷ চাচী যখন কফি দিতে বললেন আমি আর মানা করিনি। কফিই তো। বংশের বাত্তি প্রেম ভাইয়ের জন্য না-হয় কফিগার্ল হয়ে সোয়াব কামাই করে নিলাম। ট্রে সহ কফি নিয়ে প্রেম ভাইয়ের ঘরে যেতেই আমি চমকে ওঠলাম। প্রেম ভাই খালি গায়ে ফোন কানে চেপে ঘরময় ব্যস্তভাবে পায়চারি করছেন। ওনার পরণে শুধুমাত্র থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট। ফুলো পেশী দেখে আমি ঢোক গিললাম।বুকের এবস গুলো এমনভাবে ফুলে আছে দেখে লজ্জা পেলাম। একটু মন খারাপও হলো। প্রকৃতি কত নিষ্ঠুর! সত্যিই যার যেটার দরকার নেই, তার ভাগ্যে সেটাই পড়ে বোধহয়। ওনি ফোনে কাউকে বলছেন,
— ‘ আমি বোধহয় ওকে ভালোবেসে ফেলেছি। আমার ইনফ্যাচুয়েশান হয়নি। এটা ভুল। এটা অন্যায়। এমনটা হওয়া উচিত নয়। আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে…’ বলতে বলতে দরজায় আমাকে দেখে ওনি ভূত দেখার মত চমকে উঠলেন। কান থেকে ফোন সরিয়ে তড়িঘড়ি করে দরজার কাছে এসে ধমকে উঠলেন, — ‘ কি চায়?’
আমি ওনার রুক্ষ্ণ কন্ঠে চমকে উঠলাম। কই আগে তো এভাবে কথা বলতেন না। হ্যাঁ প্রেম ভাই বরাবরই কম কথা বলা মানুষ। আমার সঙ্গে রুক্ষভাবে কথা বলেননি কোনোদিন। আমি কিছু বলার আগে ওনি কফিটা আমার হাত থেকে ছিনিয়ে নিলেন। গরম কফি ছলকে পড়ল আমার হাতে। আমি উফফ করে উঠলাম। অথচ আমার কোঁকানোতে কিচ্ছু এলো-গেলোনা ওনার। বরং যেন ঢের বিরক্ত হলেন। সেই বিরক্তিকর রেশ টেনে বললেন,
— ‘ আদব-কায়দার এত অভাব জানা ছিল না। অবশ্য জাতটাই তো খারাপ। এবাড়ির কাজের লোক গুলো কি মরে গেছে? যার-তার হাত দিয়ে আমার জন্য খাবার পাঠানো লাগবে?’ ওনার রুঢ় বাক্য চাচীও শুনলেন। ছুটে এলেন তিনি। আমাকে অগ্নিদৃষ্টিতে দেখে নিয়ে চাচীকে উদেশ্যে করে রুক্ষভাবে বললেন,
— ‘ আমার কাজ গুলো করার জন্য চাকর-বাকরের অভাব পড়েছে নাকি মা? পড়লে বলো আমি বেতন দিয়ে নতুন কাউকে রাখব। তা-ও যার-তার হাতে আমার খাবার পাঠাবে না। ‘
চাচী ওনাকে ধমকালেন। তবে আমি? সেইদিন আমি বাকহারা হলাম। সত্যিই হলাম। কারণ সেই সত্যিটা সবাই জানলেও কেউ কখনো মনে করিয়ে দেয়না এবাড়ির, সেই কুৎসিত সত্যকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে আমায় অপমান করলেন ওনি! দাঁড়িয়ে থাকার মত আমার শরীরে বল নেই একফোঁটা। ছুটে পালিয়ে এলাম। এসে দোর আটকে বসে রইলাম। সেদিন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম বেঁচে থাকা অবস্থায় আর কোনোদিন প্রেম ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলবনা। না মানে নো। নো মানে না। বলবই না। সেই লোক পৃথিবীর শেষ জীব হলেও তার কথা বলব না। সেই ঘটনার কয়েক বছর পেরিয়েছে। আমি জ্ঞানত ওনার সঙ্গে কথা বলিনি। প্রেম ভাইও অপরিচিত আমার জন্য। তবে সেই পণ ভাঙার বন্দোবস্ত করল ওই বিচ্ছুদের বিচ্ছুগিরির কারণে। নয়তো আমি আমার কথা রাখার ব্যপারে পাকা। আমি বুকে সাহস সঞ্চয় করে ধানক্ষেতের একটা অন্ধকারাচ্ছন্ন মাচার উপর গিয়ে বসে পড়লাম। মোবাইলটা সঙ্গে করে এনেছি আয়াতুল কুরসি ডাউনলোড করে। ভয় পাওয়া মাত্র আয়াতুল কুরসি চালিয়ে দেব। ক্ষেতের আল পেরিয়ে বড় গাছটার নিচে বাঁশের মাচাটা আমি বসা মাত্র বুড়ো মানুষের দাঁতের মত খটমট করে নড়ে উঠল। চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। ওই বিচ্ছুগুলোর টর্চের আলো বহুদূর থেকে দেখতে পেয়ে বুঝলাম ওরা আমাকে রেখে পালিয়ে গেল। খোলা প্রান্তরে, রাতের অন্ধকারে সুনশান ধানক্ষেতে আমি সম্পূর্ণভাবে একা। জেদের বসে রইলাম ঠিকই কিন্তু ছায়ার নড়াচড়া, নিশাচর পাখিদের ডানা ঝাপটানো, ঝিঝিপোকাদের অশরীরী ডাকে শিউরে ওঠলাম আমি। তবে জেদ চেপে বসে রইলাম। প্রেম ভাই নামক মানুষটার সঙ্গে আমি একবাক্যও বিনিময় করব না। কতক্ষণ গড়িয়েছে আমি জানিনা। সময়ের হিসেব রাখতে পারিনি। আচমকা নজরে এলো ধানক্ষেতে আলোর ওঠানামা! আর এক বিশাল ছায়ামূর্তির বিরামহীন উড়ে বেড়ানো! ছায়ামূর্তির মুখটা যেন আমার দিকেই ফেরানো! আমি হকচকিয়ে গেলাম। ওটা ওখানে কি? ঠিক তখনই খেয়াল করলাম ছায়ামূর্তিটি ধীরেধীরে লম্বা হয়ে আমার দিকে ধেয়ে আসছে! আমি মোবাইল উঠিয়ে আয়াতুল কুরসি চালানোর কথাও ভুলে গেলাম৷ বরং বিকট শব্দে মোবাইল ফোনটা হাত থেকে পড়ে কোথায় যেন হারিয়ে গেল। আর আমার পায়ের কাছে কিছু একটা হিসহিসিয়ে উঠল। অবচেতন মনে হলেও আমি জানি ওটা একটা সাপ। গ্রামে সাপ-খোপ থাকবেই। সাপ নিশাচর প্রাণী৷ তারা রাতে চলাচল করে। আমিই বরং ভুল সময়ে এন্ট্রি নিয়েছি। আমি অসাড় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। তবে সম্বিত ফিরল ছায়ামূর্তির অত্যাধিক কাছে আসাতে! বিকট চিৎকারে আমি ছুটে পালালাম। গোল্লায় যাক ডেয়ার। জান বাঁচানো ফরজ। আমাকে এখন আমার জান নিয়ে পালাতে হবে। আমার অত দামী মোবাইলটা অব্দি ওখানে ফেলে এক ছুটে পালিয়ে এলাম। একটাবারের জন্যও পিছু ফিরে দেখার দুঃসাহস অব্দি করলাম না। সেরাতের পর আমার জ্বর এলো। আব্বা-আম্মা পালাকরে মাথার কাছে বসে রইলেন। শখের ঈদের জামা আমার পরা হলোনা। আধোঘুমে-আধোজাগোরণে সারাটা বেলা কাটল আমার। কখনো অচেতন অবস্থায় পড়ে রইলাম আমি। কখনো হুশ রইলো আবার কখনো জ্বরে বেহুশ হয়ে রইলাম আমি।

আমার জ্বর ছাড়ল ঈদের তিন-চারদিন পর। অবিশ্বাস্যভাবে হুশ ফিরতেই দেখলাম আমার মোবাইলটা বেডসাইড টেবিলে রাখা। মোবাইলের রহস্য অবশ্য ভেদ করতে পারলাম না। হতে পারে সেই ছায়ামূর্তিই মোবাইলটা পৌছে দিয়েছেন। আমার উপর দয়া করে। ওনাদের তো আর মোবাইল দিয়ে কাজ নেই। বিছানায় উঠে চুল গুলোকে হাতখোপা করে দূর্বল শরীরটা টেনে নিয়ে ঘরের বাইরে আসতেই দেখলাম প্রেম ভাই বসে আছেন৷ আমাকে ঘাড় কাত করে একনজর দেখে সটান উঠে দাঁড়ালেন৷ লম্বা পা ফেলে চলে গেলেন দৃষ্টির অগোচরে। আমি থমকালাম। কই আর কারো সঙ্গে এত অসঙ্গতিপূর্ণ আচরণ করেন না ওনি? তবে আমার সঙ্গেই কেন? আমি তাদের রক্তের কেউ নই বলে? ওনাকে বেশ উৎফুল্ল লাগছিল। যেন আমার জ্বরে তিনিই বেশি খুশি। অবশ্য তিন/চারদিন ঘর থেকে বের হইনি, আমার চেহারা ওনার নজরে আসেনি এজন্যই বোধহয় ওনি এত খুশি। জ্বরের তোড়ে আমার চোখের নিচে কালি পড়েছে। জীর্ণ শরীরটাও প্রায় ভেঙে গিয়েছে। শুস্ক ঠোঁট ফেঁটে খরার ন্যায় লাগছে। কদিনের জ্বরের ঘোরে বাড়ির প্রতিটা মানুষকে আমি দেখেছিলাম তবে এই মানুষটা! আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, ওনার বিরুপ আচরণকে সম্পূর্নরুপে অদেখা করে আম্মার খোঁজে গেলাম আমি কিংবা আমার জ্বর নিয়ে ওনার কোনো মাথাব্যথা নেই। আমারও নেই। তবে আমার অসুখের জন্য দায়ী ওনিই।
আমাকে সুস্থ দেখে বিচ্ছুর দল নড়ে-চড়ে বসল। সকলে ঠোঁট টিপে হাসল। আমি সরু চোখে ওদের দিকে তাকিয়ে বললাম,
— ‘ তোরা কিছু বলবি?’
সায়মা কথা শুরু করল। তাচ্ছিল্যের সঙ্গে হেসে বলল, — ‘ তুই ফেইল প্রিয়। ‘
আম্মা আমার জন্য একবাটি ড্রাগন ফল কেটে দিয়ে হুকুমজারি করে গিয়েছেন,
— ‘ বাটিতে একপিসও যেন অবশিষ্ট না থাকে।’
আমি অবশ্য ভালো মেয়ে। জোর করে হলেও সব খেয়ে নেব। কাঁটাচামচ গেঁথে ফলের টুকরো মুখে পুরতে পুরতে বললাম, — ‘ কে বলেছে আমি ফেইল? ওটা আমার টাস্ক ছিলই না। আমি অন্যটাই আগ্রহী। ‘
— ‘ তারমানে তুই প্রেম ভাইকে প্রেমের প্রস্তাব দিবি?
আমি মুচকি হাসলাম। ওখান থেকে উঠে যেতে যেতে বললাম, — ‘ শুধু দেখ না? ‘
বলেই ওদের সামনে থেকে চলে এলাম। আমি জানি ওরা আমার দিকে বিস্ফোরিত নেত্রে চেয়ে আছে৷ তবে হু কেয়ারস? ওদের ঢংয়ের ডেয়ার কিংবা প্রেম ভাই কারো প্রতি আমার কোনো ইন্টারেস্ট নেই। ওরা আমাকে মন থেকে কেউ পছন্দ করেনা। নয়তো ধানক্ষেতে আমাকে কেউ একা ফেলে আসত না। তবে আমি ডেয়ার পূরন করব। তারপর এই বিচ্ছুগুলোর সঙ্গে সারাজীবনের মত কথা বলা বন্ধ করে দেব।

সেদিন রাতে বিচ্ছুগুলোকে নিয়ে সুযোগ বুঝে ছাদে চলে এলাম। ওরা ট্যাংকির পেছনে লুকিয়ে থাকল আর আমি থাকলাম প্রেম ভাইয়ের অপেক্ষায়। প্রেম ভাই প্রতিদিনই রাতে ছাদে আসেন। আজও এসেছেন। আমাকে বোধহয় দেখেননি। মোবাইলের স্ক্রিনে কি যেন দেখে মুচকি মুচকি হাসছেন। হুট করে আমার পদধ্বনি শুনে চমকে গেলেন। মোবাইলটা জলদি বন্ধ করে আগুন চোখে চাইলেন। বললেন, — ‘ এখানে কি? আদব কায়দা নেই? না বলে আমার ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়েছিস কেন? ‘
আমি গম্ভীরমুখে মাথা নাড়লাম। বললাম,
— ‘ আমি আজকে যা দেখলাম সবাইকে বলে দেব? আপনার সব সিক্রেট আমার সামনে ফাঁস হয়ে গেছে। ‘
প্রেম ভাই চমকে গেলেন। বিস্ফোরিত নেত্রে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। যেন বুঝে উঠতে পারছেননা কি বলবেন। আমি দুকদম এগিয়ে ওনার মুখোমুখি দাঁড়ালাম। ওনি তোতলানো কন্ঠে বললেন, — ‘ দেখ প্রিয়! তুই যেমনটা ভাবছিস.. তেমন কিছু নয়। আমার কথাটা শোন।’
আমি মুচকি হাসলাম। জ্বরে রুক্ষ হওয়া চুল গুলোকে একপাশে এনে বললাম,
— ‘ তাহলে এখন যেটা হবে সেটা আপনি কাউকে জানাতে পারবেন না। ‘
ওনি বললেন, — ‘ কি হবে?’
— ‘ আগে বলুন, ডিল? ‘
ওনি একটা তপ্ত শ্বাস ফেললেন। ফেলে বললেন,
— ‘ ডিল।’
আমি এগিয়ে গিয়ে ওনার টিশার্টের কোনা আকড়ে ধরলাম। পা-টা উঁচু করে ওনার উচ্চতায় পৌছানোর ব্যর্থ প্রচেষ্টা করে বললাম, — ‘ প্রেম করবেন প্রেম ভাই?’ বলেই ওনাকে ছেড়ে দিলাম আর ঠিক তখনই দেখলাম রাগে ওনার দুচোখ র ক্ত বর্ণ ধারল করলো৷ ডান হাত উঠিয়ে আমাকে থাপ্পড় দিতে উদ্যত হতেই আমি পালিয়ে এলাম।

ঈদ শেষ আমরা সবাই ঢাকা ফিরে এলাম। সেই ঘটনা ওনি চেপে গেলেন। কেউ কোনো অভিযোগ করলোনা। প্রেম ভাইও এলেন। ইদানীং প্রেম ভাইকে আমি লক্ষ্য করি। আড়ালে-আবডালে ওনাকে লক্ষ্য করতে আমার ভালো লাগে। প্রেম ভাই প্রতিদিন ফজরের আজানের সময় উঠেন। এরপর মসজিদে যান। ওখান থেকে এসে পড়তে বসেন। টানা তিনঘন্টা পরে ওনি পার্কে দৌড়াতে যান। সেখান থেকে ফিরে এসে নাস্তা করে ভার্সিটি যান। ফেরেন বিকেল পাঁচটা নাগাদ। এসেই ঘুমিয়ে যান। একেবারে উঠে মাগরিবের সময়। ওনার প্রায়ই মসজিদে যেতে দেরি হয় বলে অর্ধেক কফি খেয়ে বাকিটা ডায়নিং টেবিলে রেখে যান। বাসায় ফিরে কিছুক্ষণ চাচীর সঙ্গে গল্প করে তারপর আবার বেরিয়ে যান। আর ফেরেন রাত দশটাই। রাতে ওনি খুব সামান্য খাবার গলাধঃকরণ করেন৷ এই যেমনটা তিনটা ডিম সিদ্ধ, কিছু ফ্রুটস আর একবাটি ওটস। এই ওনার রাতের খাবার। মাঝেমাঝে আবার সিদ্ধ ডিমের বদলে চিকেনের কোনো একটা আইটেম খান। রাতে কফিটফি কিছুই খাননা প্রেম ভাই। তবে পরীক্ষা থাকলে ভিন্ন কথা। সেদিন মগের পর মগ কফি গলাধঃকরণ করেন আর ঘরময় পায়চারি করে পড়াশোনা করেন। আর এইযে ওনার রুটিন এগুলো গড়গড় করে আওড়াতে পারার কারণ আমি ওনার প্রতিটা পদক্ষেপে নজর রাখি। ওনি আমার প্রতি এতটা বিরুপ কেন?চাচী আমাকে মেয়ের মত স্নেহ করেন। ওনার বড় বোন প্রেমা আপু আমাকে ছোটবোনের মত ভালোবাসেন৷ একমাত্র প্রেম ভাইই আমার উপর রাগান্বিত! কারণ খুঁজতেই এতটা ধ্যান ওনি পেয়েছেন।
একদিন বাড়িতে বড়দের আলাপ শুনলাম। আব্বার ব্যবসায়ী বন্ধু নাকি আমার জন্য বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছেন। ছেলে অস্ট্রেলিয়া থাকে। আংকেলের ব্যবসা দেখাশোনা করে। আজকালকার যুগে এমন ছেলে হাতছাড়া করা যায়না। বড়চাচা, আব্বা আর দাদাজান বসলেন। সেখানে প্রেম ভাইকেও ডাকা হলো। প্রেম ভাইয়ের এবছর বুয়েটের ফাইনাল ইয়ার। ইদানীং ওনি বাড়িতেই থাকেন। সারাদিন বইয়ে মুখ গুঁজে পড়াশোনা করেন। রাতে ছাদে উঠেও পড়েন। আমি নাক সিটকে ওনার পড়া দেখি। জীবনে এত পড়তে কাউকে দেখিনি আমি। পারিবারিক বিয়ের আলাপে প্রেম ভাইকে কেন ডাকা হলো তাতে আমি বেশ চটে গেলাম। বলা বাহুল্য আমাকে আর আম্মাকেও ডাকা হয়েছিল। পাত্রের খোঁজ-খবর নেয়া শেষ। এখন শুধু আমাকে জানিয়ে দেয়া হবে সেটা মতামতের নাম করে। অবশ্য তাতে অসুবিধা নেই। আমি বিয়ে করে এবাড়ি,প্রেম ভাইয়ের নজরের সামনে থেকে সরতে পারলেই যেন বাঁচি। দাদাজান জানালেন, — ‘ সাহির ভালো ছেলে। অস্ট্রেলিয়ায় ম্যাথম্যাটিকসে পিএইচডি করেছে। বাবার ব্যবসা সামলাচ্ছে। নিয়মিত মসজিদে যায়। কোনো বদ্যাভ্যাস নেই। তোমার জন্য আমরা তাকে নির্বাচন করেছি। তোমার কি মত প্রিয়?’
আমি ওড়নার কোনা আঙুলে পেঁচিয়ে কিছু বলার আগে প্রেম ভাই বলে উঠলেন,
— ‘ ওকে জিজ্ঞেস করছেন কেন? ও ভালোর কি বুঝবে? বরং ওর মত অকর্মন্যর বিয়ে ওই পরিবারে দিলে আমাদের পরিবারের নাম খারাপ হবে। ‘
আমি রেগে গেলাম ভীষণ। বড়দের উপেক্ষা করে বললাম,
— ‘ আপনার অপিনিয়ন চাইছে কে প্রেম ভাই? আমার আব্বা আছেন। ওনি ভালো বুঝবেন। ‘
আমার কথায় প্রেম ভাই বাঁকা হাসলেন। কেমন যেন বিদঘুটে লাগল সেই হাসিকে আমার কাছে। বললেন, — ‘ ডি ব্লকের আশফির সঙ্গে কথা বলার সময় তো চাচাকে জানানোর প্রয়োজন দেখলাম না। ‘
সকলের মাঝে কথাটা বজ্রপাতের ন্যায় পড়ল। প্রেম ভাই মিথ্যে বলার মানুষ নন। ওনি কি বোঝাতে চাইছেন সবাই জলের মত পরিস্কারভাবে বুঝল। আর বুঝল বলেই আম্মা আমার দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকালেন। আব্বা রাগে হাত মুষ্ঠিবদ্ধ করলেন আর দাদাজান বাঁকা চোখে তাকালেন। যেন আমি কোনো বিরাট অপরাধী। আমি দৌড়ে পালিয়ে এলাম। আশফি ভাইয়া চিত্রার বয়ফ্রেন্ড। চিত্রার কবুতরের দায়িত্ব পালন করি আমি মাঝেসাঝে। সেই কবুতর হওয়াই বোধহয় কাল হল আমার জন্য। আগেই বলেছিলাম প্রেম ভাই আমাদের গোষ্ঠীতে সেরা। তার কথায় কোনো ভূল নেই। অতএব সমস্ত দায় আমার!
সেদিন রাতে আম্মা ভীষণ বকাবকি করলেন। আব্বা চাপা রাগ দেখালেন। আর আমার সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ল প্রেম ভাইয়ের উপর। রাগে উন্মাদ হয়ে একটা সিদ্ধান্ত নিলাম। ওনাকে আমার প্রেমে ফাঁসিয়ে ছ্যাকা দিয়ে দেব৷ তারপর অন্য কোথাও বিয়ে করে নেব। ব্যস তারপর থেকে বাসায় সারাক্ষণ সেজেগুজে থাকি। শাড়ি পরি কখনো আবার চুড়িদার পরে রঙঢং করি। আম্মাকে জড়িয়ে ধরে স্যরি বলে সব মিটিয়ে নিলাম। বললাম এমন আর কখনো হবেনা। তবে আমার মনের আগুন নিভে নি। প্রেম ভাইয়ের জন্য আমি অপমানের বন্দোবস্ত করব। অবশ্যই করব।সুযোগ অবশ্যই আসবে। তাকে পুরো পরিবারের সামনে আমাকে নিচু দেখাতে আমি যেকোনো স্তরে নামতে পারি। হ্যাঁ ওনি যেমন আমাকে রক্তের সম্পর্ক বিচারে আপন ভাবেন না। আমিও তাকে কিছুই ভাবিনা। সকলের চোখে ওনি যেমন আমায় নিচু করেছেন, আমার রক্ত খারাপ এটা ভেবে নিয়েছেন আমিও তাই-ই করব।ওনাকে ওনার ভাষায় জবাব দেব।

কিছুদিন পর আবার সেই বিচ্ছুবাহিনী এলো আমাদের বাসায়।আমি ওদেরকে পাত্তা দিলাম না। যা ইচ্ছে বলুক। তারপর থেকেই শুরু হলো ওদের ঠোঁট টেপা হাসি। আমাকে দেখলেই বিশ্রীভাবে হাসছে। আমি বিরক্ত হলাম। সেদিন প্রেমা আপুরাও এলো। আমি আবার শাড়ি পরলাম। পাতলা সিল্কের কালো শাড়ি। ফর্সা গায়ে শাড়িটা একেবারে জ্বলজ্বল করছিল আমার। বিচ্ছুর দলের সায়মা আর আরজু আমাকে দেখে হিংসায় জ্বলে পুড়ে গেল। প্রেমা আপুর ছেলেকে নিয়ে সারাঘর ছোটাছুটি করলাম। শাড়ির দিকে খেয়াল রইলো না। রাতে খাবার সময় আপু আমাকে উদেশ্যে করে বললেন, — ‘ যা তো প্রিয়, উপরে আমার ব্যাগে মুহিনের জন্য ফিডার রাখা আছে। এনে দে না বোন। ‘
টেবিলে প্রেম ভাই ব্যতীত বাড়ির মেহমান, সদস্য সকলে উপস্থিত। আমি হেসে সায় জানিয়ে দোতালায় চলে এলাম। প্রেমা আপুর ঘর প্রেম ভাইয়ের ঘরের পাশেরটা। ঘরটা একেবারে কোনায়। বিশাল হলঘরের ওপাশে থাকা ডায়নিং এরিয়া থেকে এঘরের কিছু দেখা যায়না। আমি আঁচল দুলিয়ে, হেলেদুলে দোতালায় আসতেই বিদ্যুতের লাইন চলে গেল। ঘর আমার চেনা। বাইরে থেকে আলো আসছে হালকা-পাতলা। সেই আলোয় ঘরে এগিয়ে যেতেই দরজা লাগানোর আওয়াজ পেলাম। আমি ঘুরে তাকালাম। মানুষটাকে চিনতে আমার অসুবিধা হলোনা। প্রেম ভাই! আমি চমকে উঠলাম। অশনী সংকেতে মন আনচান করে উঠল। প্রেম ভাই ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন। আমি তোতলানো কন্ঠে বললাম, — ‘ প্রেম ভাই!’
ওনি ধীর পায়ে এলেন। এসে বললেন, — ‘ এখানে কি করছিস?’
— ‘ মুহিনের ফিডার নিতে এসেছি।’
— ‘ পেয়েছিস?’
— ‘ না। আচ্ছা.. আমি যাই? আপুকে পাঠাই। ‘
অন্ধকারে ওনার অবয়ব বুঝতে পারলেও আমি মুখভঙ্গি বুঝতে পারলাম না। সে চলে আসার জন্য পা বাড়াতেই প্রেম ভাই বললেন, — ‘ শাড়ি পরা শুরি করলি কবে থেকে?’
— ‘ আপুরা এলেন তা-ই।’
— ‘ তোকে শাড়িতে মানায় প্রিয়। ‘
ওনার কথার আগামাথা কিছু না বুঝে আমি বললাম,
— ‘আমি নিচে গেলাম। বাড়িতে সবাই আছেন।’ বলেই আমি দরজা খুলে বেরিয়ে আসতেই দেখলাম সকলে দাঁড়িয়ে আছে দরজার সামনে। এমনকি দাদাজানও লাঠিতে ভর দিয়ে হতবম্ভ হয়ে আছেন। আমি বের হতেই ইলেকট্রিসিটি চলে এলো। আম্মা এগিয়ে এলেন। বললেন ,
— ‘ অন্ধকারে এখানে কি করছিস?’ আম্মার কথার মাঝেই প্রেম ভাই বেরিয়ে এলেন। ওনাকে দেখে চাচী আর্তনাদ করে উঠলেন, — ‘ প্রেম!’
আমি কপাল কুঁচকে পিছু ফিরতেই আমার পায়ের তলার মাটি কেঁপে উঠল। প্রেম ভাই-এর এমন অবস্থা কেন? খানিক আগেও টিশার্ট ছিল ওনার পরণে। এখন কিচ্ছু নেই। এলোমেলো চুল, গলায় লিপস্টিকের দাগ, পরণে প্যান্টের হুক খোলা! সকলে আমার দিকে ঘৃণা ভরে তাকাল। আমি সাফাই দেয়ার মত করে বললাম, — ‘ তোমরা যেটা ভাবছো তেমন কিছু নয়। আমার কথা শোনো! ‘
তবে আমার কথায় কেউ কর্ণপাত করলেন না । আম্মা এগিয়ে থাপ্পড় দিলেন। বললেন,
— ‘ র ক্তটাই তো খারাপ। ‘
সকলে নানাধরণের কথা বললেন। সায়মার মা বললেন, — ‘ আমার বোনঝি বলে হবে কি? একেবারে বাপের রক্ত পেয়েছে। ‘ আমি বসে পড়লাম। ঘৃণা ভরে তাকালাম প্রেম ভাইয়ের দিকে। যিনি নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন। ঠোঁটের কোনে তাচ্ছিল্যের হাসি। ওনি আমার উপর প্রতিশোধ নিলেন! আমি ছুটে বেরিয়ে গেলাম ওখান থেকে। ছাদে টাংকির উপর উঠে বসলাম। মানুষের কটুবাক্য আমার সহ্য হয়না। উপর থেকে নিচে তাকালাম। ঠিক আছে। আমি প্রেম ভাইকেই জিতিয়ে দিয়ে যাই ভেবেই উঠে দাঁড়ালাম। চারতালা থেকে লাফ দিলে নিশ্চয় কেউ বাঁচবেনা! ঠিক তখনই প্রেম ভাই এসে টেনে ধরলেন আমার হাত৷ আমি ক্ষেপে গিয়ে ওনাকে থাপ্পড় মে রে দিলাম। বললাম, — ‘ কেন করলেন আপনি এটা?’
ওনি বোধহয় কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। তার আগে বাড়ির লোকের আনাগোনা হলো ছাদে। আম্মা আমাকে টেনে নামিয়ে আনলেন। হলঘরে একজন মুরুব্বি বসে আছেন। হাতে রোল করা খাতা। গলায় লাল-সাদা রুমাল। আমার বুঝতে বাকি নেই কিছু। ওই মানুষটার সঙ্গে আমার বিয়ে দিতে উঠে পড়ে লেগেছেন বাড়ির লোক। পরবর্তী ঘটনা গুলো ঘটল একটা ঘোরের মধ্যে৷ কবুল বলেই আমি গিয়ে দরজা আটকে বসে রইলাম। আর কারো কোনো খবর জানিনা। জানতে চাইও না। আজ আমার বাবা-মা বেঁচে থাকলে আমাকে যেই লোক এতবড় অপবাদ দিল সেই লোকের সঙ্গে কোনোদিন বিয়ে দিত না। তাছাড়া ওনি অন্য কাউকে ভালোবাসেন। আমি অনেকদিন থেকেই জানতাম। আমাকে বোধহয় শিক্ষা দিতে চেয়েছেন। আর বাড়ির লোক ওনাকে ধরে বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন আমার সঙ্গে। আমি পরদিনও ঘর থেকে বের হলাম না। পড়াশোনা লাটে উঠল। আমি ঘরবন্দি থাকি। আমাকে নিয়ে নানারকম রটনা কানে এলো। আব্বার মাথা হেট হলো। একদিন ঘর থেকে বেরোতেই দেখলাম প্রেম ভাই বেরোচ্ছেন। সেই ওনার চিরচেনা সাজগোজ। দামী টিশার্ট, রোলাক্সের ঘড়ি, হাতে আই-ফোন। আমি ঘৃণা নিয়ে ওনার দিকে তাকালাম। বাড়িতে আজ কেউ নেই। এটা আমি জানি। কার যেন বিয়ে সেখানেই গিয়েছেন সকলে। আমি যাইনি। আমাকে যদিও কেউ ডাকেনি। সবাই ঠিক। শুধু আমি ভুল এবাড়িতে। আব্বা আমাকে এড়িয়ে চলেন। আম্মা না পারতে একটা-দুইটা কথা বলেন।চাচীর দুচোখের বিষ আমি। দাদাজান আমার দিকে ফিরেও তাকান না। আর যেই লোকের কারণে আমি বদনামের ভাগীদার হলাম সেই লোক এখনো বুক ফুলিয়ে হেঁটে বেড়ায়। প্রেম ভাই বেরিয়ে গেলেন। আমি রাগে উন্মাদ হয়ে ওনার ঘরের দিকে গেলাম। ওনার ঘড়ির অনেক কালেকশান। সেসবই আজ নষ্ট করব আমি। আমার গোটা জীবন নষ্ট করে তাকে আমি শান্তিতে থাকতে দিব না। আমি ওনার ঘরে যেয়ে ঘড়ি খুঁজতে থাকলাম। ঠিক তখনই চোখ পড়ল ওনার বেডসাইড টেবিলের ড্রয়ারের চাবি ঝুলছে। আমি সেদিকেই ছুটলাম। ড্রয়ার টানতেই বেরিয়ে এলো মোটা ডায়রী। ওটা বের করে ছিড়ে খুঁড়ে ফেলতে চাইলাম। কয়েকটা ঘড়ির বক্সও পেলাম। তুলে আছাড় দিলাম ওগুলোকে। ডায়রী খুলে পড়তে শুরু করলাম। নিশ্চিত কিছু না কিছু ক্লু আমি পাব! কয়েক পেজ পড়তেই চমকে উঠলাম আমি।দরজার কাছে প্রেম ভাই দাঁড়িয়ে আছেন। ওনি ধীরেধীরে এগিয়ে এলেন। আমার হাতে ডায়রীর দিকে তাকিয়ে ধপ করে নিচে বসে পড়লেন। আকুতিভরা কন্ঠে বললেন,
— ‘ আমাকে মাফ করে দাও প্রিয়। বাড়ির লোক তোমার বিয়ে অন্য কোথাও ঠিক করছিল। আমি মানতে পারছিলামনা।আমি যা করেছি, তোমাকে নিজের করে পাবার জন্য করেছি প্রিয়। আমি তোমাকে ভালোবাসি। প্রায় চার বছর যাবত আমি তোমাকে ভালোবাসি। এই ডায়রীটা তার প্রমাণ। আমাকে মাফ করে দাও? আমি আমার ভুল সকলের সামনে স্বীকার করে নেব….. ‘ আর আমি? ওনার কথা শুনে জ্ঞান হারালাম।

(সমাপ্ত)

অণুগল্প

লেখিকা:হুমায়রা মুর্তজা

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x