পর্বসংখ্যা:১৫
লেখনীতে:প্রিয়াংশি চৌধুরী
কায়েশীর সকালটা শুরু হয়েছিলো ভোরের আলো ফোটার আগেই। আজ একটা বিশেষ দিন বলা চলে। গতরাতে কায়রাভ জানিয়েছে দুপুরে তাদের দলের ছেলেপেলেদের খাওয়ানো হবে বাড়িতে। তার বিজয়ের আনন্দের জন্য। উপরন্তু কায়রাভের ফুপুও আসবেন। কাজেই আয়োজনটা হতে হবে চোখে পড়ার মতো, যাকে বলে এলাহি আয়োজন। কায়রাভ লোক রাখার কথা বলেছিলো রান্নার জন্য। কিন্তু কায়েশী সোজাসাপ্টা না করে দিয়েছে। কায়েশীর অন্যদের দিয়ে রান্নাবান্না করানোয় সাচ্ছন্দ্যবোধ করে না, তাছাড়া সে রান্নাবান্নায় পটু হওয়ায় কাওকে প্রয়োজন নেই। অন্যের হাতে রান্নায় তার মন ভরবে না, তৃপ্তি পাবে না সে। তাছাড়া রান্নাঘর তার নিজের আলাদা একটি রাজ্য। এখানে সে একাই যথেষ্ট।
সকাল আটটা বাজতেই উনুনে আগুন জ্বলে ওঠে। একটার পর একটা পদ তৈরি করতে থাকে কায়েশী। অবশ্য কাজের ফাঁকে ফাঁকে কায়ানকে খাইয়ে আসা, আবার চুলার কাছে ফেরা। কায়রা আজ পুরো দায়িত্ব নিয়েছে কায়ানের। নইলে কায়েশীর এই ব্যস্ততার মাঝে বাচ্চাটা মায়ের আঁচল ধরে টানাটানি শুরু করলে কায়েশীর কাজের সব তাল কেটে যাবে।
কায়েশী ইতিমধ্যে শিক কাবাব, চিকেন রেজালা, চিংড়ির মালাইকারি, বেগুনি ভাজা, আলুর চপ, ছোলার ডাল, খাসির মাংস, রুই মাছের তরকারি রান্না শেষ করেছে। একে একে কখন যে এতগুলো পদ শেষ হয়ে গেলো টেরই পায়নি কায়েশী। ঘড়িতে তখন সাড়ে এগারোটা। দুপুর একটার আগেই সব গুছিয়ে ফেলতে হবে। হাতে বাকি মাত্র দু-তিনটে আইটেম। এখন সে দুটো ডেসার্ট আইটেম বানাবে। গুলাব জামুন আর ফিরনি। এসবই ঘরোয়া রান্না হলেও সুস্বাদু। সর্বশেষ বাসমতী পোলাও রান্নাটা বাকি। ওটা গরম গরম পরিবেশনের জন্য সে শেষে রান্না করবে।
আজ কায়রাভ পার্টি অফিসে যায়নি। তাছাড়া বিশেষ কোনো কাজও ছিলো না। থাকলেও সহকারীকে দায়িত্ব দিয়ে রেখেছে, সে সবটা সামলে নেবে। সকালে কায়রাভ পুরোটা সময় দিচ্ছিলো কায়ানকে। বাবা-ছেলে নিজের মধ্যে খুনসুটিতে ব্যস্ত ছিলো। কিন্তু সাড়ে এগারোটা বাজার সঙ্গে সঙ্গেই কায়রাভের মনটা কেমন অস্থির হয়ে ওঠলো বউয়ের চিন্তায়। তাই ভাবামাত্র পা চলে যায় রান্নাঘরের দিকে। রান্নাঘরের দরজার সামনে যেতেই কায়রাভ পর্যবেক্ষন করে তার বউ ঝড়ের গতিতে কাজ কর চলেছে। মাঝে মাঝে আবার দেয়ালঘড়িতে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছে। টেবিলের উপর বিভিন্ন আইটেম সাজানো রয়েছে। বাহ, নিখুঁত কাজ এবং নিখুঁত সময়জ্ঞান! মনে মনে বউয়ের খুবরকম প্রশংসা করলো কায়রাভ। পরক্ষনেই এগিয়ে এসে রান্নাঘরের কিচেন কাউন্টারের বসে গলা খাঁকারি দিয়ে বলে,
” আমি কি কোনোভাবে সাহায্য করতে পারি? ”
কায়েশী ভ্রু কুঁচকে তাকায়। মনে মনে ভাবে, ইনি আবার এখানে এলো কেন? মনের ভাবনা মনে রেখেই চুলায় হাঁড়ি বসাতে বসাতে বলে,
“না, আমার কোনো সাহায্য লাগবে না। আপনি প্লিজ আপনার জনগনের সেবা করুন গিয়ে।”
কায়রাভ মুচকি হাসে।
“তুমি কি জনগণের মধ্যে পড়ো না? আর তাছাড়া বউদের সেবা করা স্বামীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ। এতে ঘরে শান্তি বজায় থাকে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মিল-মহব্বত বাড়ে।”
কায়েশী দু ভ্রু উঁচু করে নেয় অবাক ভঙ্গিমায়। তবুও কাজ থামায় না। কেবল জিজ্ঞেস করে,
” আমাদের মিল-মহব্বত! যাইহোক, আপনি আর আপনার যুক্তি! তা এটা কোন সংবিধানে লেখা আছে?”
কায়রাভ আলতো স্বরে বলে,
“আছে হয়তো কোনো সংবিধানে। এসব বাদ দাও। এবার বলো, কিছু করে দেই আমি। ”
একটু ভেবে কায়েশী ইশারা করে বলে,
“ওই তাকে কাচের প্লেট সাজানো আছে। সেখান থেকে দুটো প্লেট এনে দিন। ওইযে নকশা করা গুলো। ”
কায়রাভ বিনাবাক্যে তাই করে। আজকাল কায়েশীর মাঝে অনেক পরিবর্তন লক্ষ্য করছে কায়রাভ ৷ তার কথায় তিক্ততা কমে আসছে, কথায় কথায় এখন আর ঘৃনা করে, ঘৃনা করে বলে না। আগের মতো তেলে জল পড়ার ন্যায় ছ্যাঁ*ত করেও উঠে না। ভারি আশ্চর্যজনক ব্যাপার! ভাবতে ভাবতে দুটো নকশা করা কাচের প্লেট এনে দিলো। কায়েশী প্লেট দুটো হাতে নিয়ে ছানা নামিয়ে রাখে। তখনই কায়রাভের চোখ পড়ে, কায়েশীর সামনের চুলগুলো বারবার চলে আসছে। রাবার ব্যান ঢিলে হয়ে যাওয়ায় চুলের মাঝখানে আটকে আছে। সিল্কি চুল হওয়ায় দুই পাকে রাবার ব্যান থাকতে চায় না। এদিকে কায়েশীর নিজের হাত তখনো ব্যস্ত, ছানা মাখার সময় চুলগুলো বেজায় বিরক্ত করছে। সরানোর ফুসরত পাচ্ছে না।
তাই কায়রাভ উঠে গিয়ে এক ঝটকায় রাবার ব্যান্ড সম্পুর্ন খুলে ফেলে। আচমকা এমন ঘটনায় কায়েশী ছিটকে উঠে পেছনে ঘুরে তাকায়। কিন্তু কায়রাভ নির্বিকার। সে কায়েশীকে আবার সামনে ঘুরিয়ে দিয়ে তিন পাক করে চুল বেঁধে দেয়। এবার বেশ শক্ত হয়েছে বাঁধন। কায়েশী আজ কিছু বললো না, শুধু হঠাৎ এমন করায় একটু চমকে গিয়েছিলো। পরপর নির্বাকভাবেই আবার কাজে মন দিল সে।
এইবার কায়রাভ দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বুকের সামনে দু-হাত ভাঁজ করে তাকিয়ে দেখতে থাকে সামনে থাকা রান্নাবান্নায় ব্যস্ত লাবন্যময়ী রমনীর পানে। একেবারে পাক্কা গিন্নির মতো সব সামলাচ্ছে সে। খয়েরি শাড়িতে কায়েশীকে আজ অদ্ভুত সুন্দর লাগছে। কায়রাভের বউ বউ লাগছে, আর কায়ানের মা মা লাগছে। বিয়ের পর কায়েশী শাড়ি ছাড়া অন্য কিছু পরে না। প্রতিদিন ভিন্ন ভিন্ন রঙিন শাড়িতে বউকে দেখার মধ্যেও কায়রাভ একধরনের সুখ খুঁজে পায়। তবু হঠাৎ করেই মনে পড়ে যায় বিয়ের আগের কায়েশীকে। তখন সে থ্রি-পিস পরতো, মাথায় ওরনা দিয়ে। সেই স্মৃতির স্পর্শে কায়রাভের মনটা আচমকা পিছলে যায় অতীতের দিকে…….
***************************
~ অতীত ~
আজ থেকে ঠিক পাঁচ বছর আগের কথা। তখন তপ্ত দুপুর। সূর্য প্রায় আগুন ঢেলে দিচ্ছিলো শহরের পিচঢালা রাস্তায়। রাজনীতির সমাবেশ ঘিরে বিশাল মিছিল নেমেছে। কায়রাভের ছেলেপেলেরা গলা ফাটিয়ে নিজেদের নেতার গুণগান গাইছে। ফিরোজ চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে স্লোগান দিচ্ছে, মাইকের বিকট শব্দে চারপাশ ভারী হয়ে উঠেছে। ফিরোজ গলা ফাটিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দিচ্ছে। আর বাকিরা ফিরোজের সাথে দ্বিতীয় লাইনে তাল মিলাচ্ছে,
রক্ত যদি কথা কয়,
কায়রাভ ভাইয়ের হোক জয়!
ভোট দিমু কারে?
কায়রাভ তাজওয়ার খানরে!
জনতার শক্তি এক নাম,
কায়রাভ তাজওয়ার খান!
মিছিলের মাঝখানে বিভিন্ন গাড়ি, বাইকের মাঝে একটি জিপ। জিপের উপর দাঁড়িয়ে কায়রাভ তাজওয়ার খান। তখন সে সাতাশ বছরের তাগড়া এক যুবক। বলিষ্ঠ শরীর, শুভ্র কুর্তা পরনে। তার চোখে প্রবল আত্মবিশ্বাস। হাত নেড়ে জনগণকে অভিবাদন জানাচ্ছে সে। তার পাশে কয়েকজন ছেলেপেলে মাইকে কথা বলছে, কাগজ বিলাচ্ছে, ভোট চাইছে।
কিন্তু এই প্রচারের মাশুল দিচ্ছিলো সাধারণ মানুষ।
মিছিলের কারণে রাস্তা পুরোপুরি বন্ধ। গাড়ির পর গাড়ি আটকে আছে। লম্বা এক লাইন! হর্ন, মাইকের শব্দে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।
ঠিক তখনই ভিড় ঠেলে সামনে এগিয়ে এলো একটি রমনী। সে এসে দাঁড়াল জিপের পাশের একটি গাড়ির সামনে। চোখে বিরক্তি থাকলেও তা লুকিয়ে নেয়। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সবুজের দিকে তাকিয়ে কণ্ঠে চাপা তাড়াহুড়ো নিয়ে বলল,
“ভাইয়া, এখান থেকে আপনাদের গাড়ি সরিয়ে রাস্তাটা ক্লিয়ার করুন প্লিজ। আপনাদের জন্য পেছনে সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পরেছে। একটা গাড়িও সামনে এগোতে পারছে না। ”
পাশে জিপের উপর থাকা কায়রাভ কিছুই টের পেলো না। মাইকের শব্দে তার কান ঝাঁঝরা হয়ে আছে। চোখ ছিল মানুষের ভিড়ে, সে জনগণের প্রতি নিবদ্ধ হয়েছিলো। সবুজ ঠোঁট বাঁকিয়ে তাকালো মেয়েটার দিকে। বলল,
“আরে আপা, আপনি কি আমাগো চিনেন না? আমরা কিন্তু কায়রাভ ভাইয়ের পোলাপান। এহন ভোটের প্রচার চলতাছে। গাড়ি সরাইতে পারুম না।”
রমনীর চোখে উদ্বেগ জমাট বাঁধে। এমনিতেই পরীক্ষা দিতে যেতে দেরি হচ্ছে আর এরা বলছে পারবে না! বুকের ভেতর অস্থিরতা জমে উঠছে। তবুও শেষবারের মতো ধৈর্য ধরে সে বলল,
“ভাইয়া, আজ আমার পরীক্ষা। হাতে একদম সময় নেই। মাত্র দশ মিনিট হাতে আছে। আর তাছাড়া পেছনে এম্বুলেন্সে একজন প্রেগন্যান্ট মহিলা আছে, সম্ভবত তার ডেলিভারি হবে। একটু পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করুন।”
সবুজ মাথা নেড়ে অবহেলায় বলল,
“আমারে এসব বইলা লাভ নাই, আপা। খুব সমস্যা হইলে হাঁইটা যান। আমাগো গাড়ি সরাইতে পারুম না।”
এইবার রমনীর ধৈর্যের বাঁধ ভাঙলো। দাঁতে দাঁত চেপে সে বলল,
“শেষবারের মতো ভালো ভাবে বলছি ভাইয়া, গাড়িগুলো সরাবেন, কি না? ”
“না।”
সবুজ বিরক্ত হয়ে জবাব দিলো,
“হুদাই প্যাচাল পাইরা সময় নষ্ট করতাছেন ক্যান? এতক্ষনে তো আপনি হাঁইটাই যাইতেন গা?”
পরের মুহূর্তেই রমনী অগ্নিমূর্তি রুপ ধারণ করে। ধৈর্য্য হারিয়ে রাস্তার পাশে ধুপধাপ পায়ে এগিয়ে ফুটপাত থেকে একটি রড তুলে নিল সে। চোখে রীতিমতো আগুন জ্বলছে, হাতে যেন অসুর ভর করলো মুহুর্তেই। তারপর দৌড়ে এসে সর্বশক্তি দিয়ে আঘাত করলো সবুজদের গাড়ির ফ্রন্ট কাচে। একটা বিকট শব্দ হয়ে ঝরঝর হয়ে ভেঙে পড়ল কাচ। তারপর একে একে রমনী আঘাত করতে লাগলো গাড়ির গায়ে, জানালার কাচে। সবুজ এসবে হতবিহ্বল হয়ে যায়। হুস ফিরতেই হায়হায় করে চেঁচিয়ে উঠলো,
“হায় হায়! এসব কি করতাছেন? আপা পাগল হইয়া গেছে নাকি? আপা সরেন! আল্লাহ, গাড়ি ভাঙতাছেন ক্যান! ”
রমনী অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে আবার চোখ ফিরিয়ে নিজের কাজ বহাল রেখে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বললো,
“আমি আগেই বলেছিলাম গাড়ি সরাতে। একবার না বারবার বলেছি! তোদের কাছে জনগনের কোনো কথার দামই নেই, আবার ওদের কাছ থেকেই ভিখারির মতো ভোট চাস! আজ আমার পরীক্ষা এমনিও দিতে পারবো না ওমনিও পারব না। তাই আমার ক্ষতিপূরনের দশগুণ উসুল করেই যাবো। শুধু দেখ আমি কি করি! ”
হঠাৎ মাইকের আওয়াজ বন্ধ হয়ে গেলো। প্রচার থেমে গেলো। সবাই থমকে গেলো এবং টনক নড়লো তাদের। কায়রাভ ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকালো।তাকিয়ে মেয়েটার মুখ দেখার আগেই মাথায় ওরনা দেওয়া সেই রমনী তেড়ে এসে এবার কায়রাভের জিপের ফ্রন্ট কাচে আঘাত করে আগের মতো। কায়রাভ চোখ কুঁচকে নিলো কাচ ভাঙার বিকট শব্দে। মেয়েটা ফিরোজের হাত থেকে মাইক ছিনিয়ে নিয়ে বলল,
“ওখানে এম্বুলেন্সে প্রেগন্যান্ট মহিলা যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছেন। অথচ আপনাদের প্রিয় নেতা জনগনের সুযোগ সুবিধা না দেখে রাস্তা আটকে ভোট চাইতে এসেছে? অথচ মুখে বড় বড় বুলি! এই করবে সেই করবে! আর আপনারাও কনভিন্স হয়ে সুরসুর করে এনাকে জিতিয়ে দিবেন, তাইনা?”
কায়রাভ তখনো রমনীর মুখ দেখেনি। কিন্তু মাইকে বলা নেতিবাচক কথাগুলো তার রাজনৈতিক জীবনে দাগ কাটতে পারে, এটা সে বুঝে গেছে। হুট করেই রাস্তায় হইচই লেগে যায়। মেয়েটার অতি সাহস দেখে অবাক হচ্ছে কায়রাভ! কিন্তু এরকম কথায় মুহুর্তেই মাথায় খুন চেপে বসে তার। ভাবলো হয়তো বিপরীত দলের কেও শত্রুতা করে পাঠিয়েছে তার ইমেজ নষ্ট করতে। তাই তারাতাড়ি পেছন থেকে মাইক কেড়ে নিয়ে সে মেয়েটার হাত ধরে এক ঝটকায় ঘুরিয়ে বলতেই যাচ্ছিলো,
“এই মেয়ে!! তোর সাহস….”
পুরোটা বলার আগেই কায়রাভের কথা কন্ঠনালীতেই আটকে যায়। চোখ আটকে যায় রেগে অগ্নিমুর্তি ধারন করা ধবধবে ফর্সা নারীটির পানে। তেজি চোখে তাকিয়ে আছে সে, যেন এক নিমেষে ভস্ম করে দেবে তাকে ওই দুটো নয়ন। টকটকে ঠোঁটজোড়া তিরতির করে কাঁপছে সামান্য, হয়তো রাগে। মাথার ওরনাও ইতিমধ্যে খসে পরেছে। কায়রাভ অপলক তাকিয়ে রইল৷ রমনী হাত ঝাঁকি দিয়ে ছাড়িয়ে নিয়ে বলে,
“এখনো সময় আছে। আপনার ছেলেদের রাস্তা খালি করতে বলুন!”
এক মুহূর্ত দেরি না করে কায়রাভ হাত তুলে ইশারা করলো সবুজকে। কিন্তু রমনীর থেকে দৃষ্টি সরায় নি। পরপরই গাড়িগুলো সরে যেতে লাগলো। এম্বুলেন্সটাও পথ পেলো। তারপর মেয়েটার খেয়াল হলো মাথার ওরনা নেমে গেছে। চট করে ওরনা জড়িয়ে নেয় আবার। সামনের সিএনজি থেকে এক মেয়ে ডেকে উঠে,
“কায়েশী! তারাতাড়ি আয়! এখনো খুব লেট হয়নি। পরীক্ষা শুরুর দশ মিনিট হয়েছে সবে।”
কায়েশী ঘুরে এগোতেই যাচ্ছিলো, ঠিক তখনই এক পুরুষালী হাত তার কব্জি চেপে ধরল। কায়েশী এতক্ষন যতটা সাহস দেখাচ্ছিলো তা যেন এক মুহুর্তেই থেমে যায়। কায়রাভ গম্ভীর স্বরে সিএনজি চালককে নির্দেশ দেয়,
“আপনি আপনার যাত্রী নিয়ে চলে যান।”
তৎক্ষনাৎ সিএনজি ছেড়ে দিলো। সিএনজিতে বসা মেয়েটাও হতবুদ্ধি হয়ে যায়। কিন্তু পরীক্ষার জন্য কিছু বলার অপেক্ষাও রাখে না। নিজের ভালো আগে দেখতে হবে তার। এমনিতেই তার দেরি হচ্ছিলো।
এদিকে কায়েশী পেছন ঘুরে তাকিয়ে হাত ছাড়াতে ছাড়াতে বলে,
“এটা কোন ধরনের অসভ্যতা! হাত ছাড়ুন! আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে!”
কায়রাভ বাঁকা হেসে হাত টেনে এক ঝটকায় কায়েশীকে নিজের একদম কাছে টেনে আনে। হাত পেছন দিকে মুচড়ে ধরে কায়েশীকে সামনা-সামনি করে রাখে। উন্মাদগ্রস্থের ন্যায় ঘাড় বাকিয়ে চোয়াল শক্ত করে বলে,
“অসভ্যতা! তুমি এতক্ষন যেটা করলে সেটাকে কি বলে? অবশ্য সেটাকে চরম মাত্রার দুঃসাহসিকতা বলা চলে।”
কায়েশী এইবার আতঙ্কে জমে যায়। এমনিতেই মুচড়ে ধরা হাতে ব্যাথা করছে তার। ছাড়ানোর জো নেই। যতই সাহস দেখাক, এভাবে বেকায়দায় পড়লে যে কেও ভয় পাবে। কায়রাভ আবার বলে,
“তুমি তো পরীক্ষা দিতে যেতে পারবে না, মেয়ে। ক্ষতি আমাদের দুজনেরই সমান হওয়া উচিত, তাইনা?”
কায়েশী ছটফট করতে করতে বলে,
“হাত ছাড়ুন, আমার! আমি চেঁচাবো কিন্তু বলছি!”
“চেঁচাও! এত বড় ব্লান্ডা*র করেও এখনো তেজ কমছে না! আমার ইমেজ নষ্ট হতে যাচ্ছিলো! তোমার জাস্ট ধারণা নেই এর জন্য আমি তোমার সঙ্গে ঠিক কী করতে পারি।”
কায়েশীর চোখে ভয় নেই, আছে শুধু তেজি দৃষ্টি। খানিকটা সাহস করেই বলল,
“ধারনা আছে। কি করবেন আর? স্বার্থে আঘাত লেগেছে তাই মেরে ফেলবেন, গুম করে ফেলবেন! মারুন! আমি ওসবে ভয় পাইনা।”
কায়রাভ হিতাহিত জ্ঞান হারাচ্ছে ক্রমশ। কারণ আজ তার মান সম্মানের প্রশ্ন উঠেছিলো। শত্রুরা চাইলেই এটাকে অনেক বড় ইস্যু বানাতে পারবে। এসব ভেবে রেগে গিয়ে কায়রাভ গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“উহু, মারবো না। কিন্তু তুমি পস্তাবে। খুব খারাপভাবে পস্তাবে। তাও যদি তোমার ভুলের জন্য বিন্দুমাত্র অনুতপ্ততা থাকতো!”
কায়েশী এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নেয়। যদিও কায়রাভ হাত আলগা করেছিলো তাই। হাত ছাড়ানো মাত্র কায়েশী সপাটে এক চড় মারে কায়রাভের গালে। কায়রাভ চড় খেয়ে চোখ বন্ধ করে নেয় মুহুর্তেই, মাথা ঝুঁকে আসে খানিক। সবুজ আর ফিরোজ দুজনেই স্তব্ধ, বাকহারা হয়ে যায়। কায়েশী চেঁচিয়ে অশ্রুসিক্ত চোখে বলে,
“আমি ভয় পাই না তোদের মতো, জানোয়ার*দের! শুনেছিস! এতিমদের কোনো ভয় থাকতে নেই। কারণ, আমাকে মেরে গুম করে ফেললেও কারও কিছু যায় আসবে না। আর কিসের অনুতপ্ততা! আমি কোনো ভুল করিনি! ওই ছেলেকে জিজ্ঞেস কর কতবার অনুরোধ করে বলেছি গাড়িগুলো সরাতে? কিন্তু কেও শোনেনি? আর নিজেরা ভুল করে উল্টো আমাকেই হুমকি দিচ্ছিস! প্রতিশোধ নিতে বড়জোর খুন করবি তো? করিস! এমন খুন করা তোদের বা-হাতের খেল, জানি আমি। আমারও নিজের জীবনের প্রতি কোনো মায়া নেই। আমিও আর কোনো কিছুতেই ভয় পাই না।”
কায়রাভ চুপচাপ ঘাড় বাকিয়ে খুব মনোযোগ দিয়ে শুনে চলেছে কায়েশীর কথা। মুখের অভিব্যক্তি দেখে বোঝা যাচ্ছে না তা রাগ না অন্য কিছু। ব্যস, কায়রাভ শুধু তীক্ষ চোখে নজর বুলিয়ে প্রতিটি কথা শুনছে কায়েশীর। কিন্তু এদিকে সবুজ নিজেকে থামাতে না পেরে নিজেও চেঁচিয়ে উঠলো,
“যাইহোক না কেন! আপনি আমাগো ভাইয়ের গায়ে হাত তুললেন ক্যান? আবার তুই-তোকারি করতাছেন কোন সাহসে!”
কায়েশীর অগ্নিকন্ঠে তর্জনী আঙ্গুল তুলে বলল,
“এই চুপ!! তখন ভাইয়া ডেকেছিলাম, শুনিস নি। আর তোর ভাইকে মেরেছি বেশ করেছি! আমার হাত ধরার সাহস পায় কিভাবে তোর ভাই! অন্যায় দেখেও অন্ধের মতো ভাই ভাই করছিস! ল*জ্জা নেই না?”
এবার সবুজ মিইয়ে গেলো। মুখে কিছু বলার সাহস পেলো না আর। অত:পর আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না কায়েশী। তীব্র ক্রোধে পায়ে হেঁটে চলে গেল সামনে। অতি রাগে চোখে জল এসে গিয়েছিলো তার। রাগ সামলাতে না পারলে এমন হয় তার। হাতের উল্টোপিঠে চোখ মুছলো সে। ভেতরে ভেতরে সে ক্লান্ত, বিধ্বস্ত। তার নিজের জীবনের ভয় কখনো ছিল না। থাকবেই বা কেন? তার তো কেউ নেই। সে অনাথ। অনাথদের ভয় থাকে না। তাদের সংগ্রাম করেই চলতে হয়। তারা বাঁচলেই বা কি মরলেই বা কি!
কায়রাভ এখনও মেয়েটির চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। সময় যেন হঠাৎ থমকে গেছে, চারপাশের সবকিছু নিস্তব্ধ। পাশে থাকা সবুজ মাথা নিচু করে কায়রাভের দিকে তাকালো। কণ্ঠটা কেঁপে উঠছিলো,
“ভাই, ভুলটা আমারই… আমিই….”
কায়রাভ হাত উঁচু করে থামিয়ে দেয় তাকে। তার চোখে কোনো রাগ নেই, কেবল অটল শীতলতা। ভয়ংকর রকমের শীতলতা। একটা অদ্ভুত হাসি ঠোঁটে দেখা গেলো। তারপর সে ফিরোজের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ওই মেয়ের সব ডিটেইলস চাই, আমার। কোথায় থাকে, কী করে, এভরিথিং! ”
ফিরোজ মাথা নেড়ে বলল,
“সম্ভবত আমাদের এলাকারই। আমি খবর নিয়ে আরও বিস্তারিত জানাবো, ভাই।”
কায়রাভ যাওয়ার আগে জিপ আর ভাঙা গাড়ি দুটোকে ইশারা করে সবুজকে দেখিয়ে বলল,
“এই দুটোকে সার্ভিসিং-এ পাঠিয়ে দে। বিকেলে কথা হবে।”
কায়রাভ চলেই যাচ্ছিলো পরপর থেমে পেছন ঘুরে ফিরোজকে জিজ্ঞেস করলো,
“আচ্ছা, একটা কথা বলতো ফিরোজ? তুই যে মেয়েটার সঙ্গে প্রেম করিস, তার প্রেমে পড়েছিলি কিভাবে? মানে মানুষ কখন বোঝে সে প্রেমে পড়েছে?”
সবুজ ভরকে গিয়ে বলে,
“হুট কইরা এই সিরিয়াস টাইমে এইসব কি প্রেম-পিরিতের কথা কইতাছেন, ভাই? ”
সবুজের কথায় ওরা দুজনের কেওই পাত্তা দিলো না। কারণ সবুজ ছেলেমানুষী করে চলে। তবে ফিরোজ সব বিষয়ে বেশ বিচক্ষণ। ফিরোজ নিজেও হঠাৎ কায়রাভের এমন প্রশ্নে থমকে গিয়েছিলো। এমন কথায় তার চোখে অদ্ভুত প্রশ্ন জাগলেও থামিয়ে রাখলো নিজেকে। কায়রাভের কথার প্রতিউত্তরে ফিরোজ শুধু বলল,
“প্রেম তো কোনো এক্সাক্ট কারণ দেখে হয় না, ভাই। কারনে, অকারণে যেকোনো ভাবেই হতে পারে। অবশ্য আমি প্রেমে পড়েছিলাম আমার প্রেমিকার লম্বা চুল দেখে।”
কায়রাভ নিজ ভাবনায় আনমনে বিরবির করে বলল,
“আর আমি বোধহয় থাপ্পড় খেয়ে!”
যদিও কায়রাভ ধীর গলায় বলেছিলো কিন্তু সবুজ আর ফিরোজ দুজনেই শুনতে পেয়ে চোখ বড় করে তাকালো। তবে তারা চুপ থাকলো, অবাক হলেও একটা শব্দ বের করল না মুখ থেকে। কায়রাভ চলে যাওয়ার পর সবুজ ফিরোজকে বলল,
“ভাই, কি কইলো এটা? ভাই কি তাইলে ওই খ্যা*পা আপার প্রেমে পড়ছে?”
ফিরোজ অদ্ভুতভাবে মুচকি হেসে বলল,
“মনে তো হচ্ছে তাই। তাও দেখা যাক, সময় কি বলে। তোর খ্যা*পা আপা আবার ভাবী না হয়ে যায়! ”
সবুজ মাথায় হাত রেখে অসহায় ভঙ্গিমায় বলল,
” তাইলে কাম সারছে রে! ভাইয়ের হাড়মা*স একবারে জ্বালাইয়া খাবো! যেই রঙ দেহাইলো আপায়! ”
চলমান…….
(🔺কায়রাভ-কায়েশীর অতীত এর কাহিনি বর্ননা করা হবে দু-এক পর্বে। তাছাড়া সব জুটি নিয়েই লিখবো। কারণ অবশ্যই সবার কাহিনিই আমায় শেষ করতে হবে। আপনারা এক পর্বে সবাইকে চাইলে তো হবে না। ওকে কেন লিখেন না, ওকে কম লিখেন, এদের বেশি লিখেন এসব কমেন্ট করতে বিরত থাকুন। ধারাবাহিকভাবে সবাইকেই পাবেন, প্রত্যেকের কাহিনিই বিস্তারিত হবে। আমাকে আমার মতো লিখতে দিন, নাহলে গল্পের স্বকীয়তা হারাবে।)
[ কেমন লাগছে পর্বটি জানাবেন। গঠনমুলক মন্তব্য চাই সবার। সবাই রেসপন্স করবেন আশা করি। আর ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং। 🦋 🥀]
হাই পাঠক! 🙋♀️