Golpo:Ek Chilte Sukher Asha(03)

 

পর্ব সংখ্যা [৩]

‘প্রিয় মানুষ অন্য কারো হলে তীব্র কষ্ট, হতাশা, আর শূন্যতা একসাথে আছড়ে পড়ে। মনে হয় বুকের ভেতর কেউ যেন নীরবে একটা শূন্য গহ্বর খুঁড়ে দিয়েছে। চারপাশের সবকিছু হঠাৎ অর্থহীন লাগে, ভবিষ্যৎ অন্ধকার মনে হয়, আর বেঁচে থাকার কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না।

-“ইশরাক কুহেলিকে নিয়ে আধঘণ্টা আগে বাসায় এসেছে। লাগেজ থেকে কাপড়চোপড় বের করে ফ্রেশ হতে ওয়াশরুমে ঢুকেছে। কুহেলি ধীরে ধীরে ঘুরে ঘুরে রুমগুলো দেখছে। নতুন জায়গা, অচেনা পরিবেশ—সবকিছুতেই এক অদ্ভুত নীরবতা।

হঠাৎ কুহেলির চোখ আটকে গেল বেডরুমের দেয়ালে ঝোলানো একটি ফ্রেমে। ছবিতে ওর শখা বাবু একজন সুন্দরী রমণীকে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মুহূর্তের মধ্যে যেন কুহেলির পৃথিবীটা থমকে গেল। বুকের ভেতরটা ছিদ্র হয়ে যাওয়ার মতো তীব্র যন্ত্রণা ছড়িয়ে পড়ল।

“কুহেলি মাথায় হাত রেখে ধপ করে বিছানায় বসে পড়ল। অজানা আতঙ্ক চারপাশ থেকে ওকে গ্রাস করছে। কুহেলির ছোট্ট হৃদয়টা দ্রুত কাঁপছে। গলা পর্যন্ত উঠে আসা কান্না চোখ দিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। নিজেকে কোনোমতে সামলে নিয়ে ফিসফিস করে প্রশ্ন ছুঁড়ল,“তবে কী আমার শখা বাবু অন্য কারোর?”

ঠিক তখনই ইশরাক ফ্রেশ হয়ে দ্রুত বেরিয়ে এলো। কুহেলিকে আনমনে বসে থাকতে দেখে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,“গোসল করে ফ্রেশ হয়ে আসুন। আমি বাইরে থেকে খাবার নিয়ে আসছি। কিছুক্ষণ একা থাকতে পারবেন?”

-‘কুহেলি ভারাক্রান্ত হৃদয়ে আরেকবার ফ্রেমে থাকা রমণীর দিকে তাকাল। চোখের দৃষ্টিতে প্রশ্ন, কষ্ট আর অবিশ্বাস জমাট বেঁধে আছে। পরমুহূর্তেই দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিল। জলভরা নজরে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার মুখের দিকে চেয়ে রইল। এরপর শুকনো ঠোঁটে ঢোক গিলে অস্পষ্ট কণ্ঠে বলল,“আমি একা থাকতে পারি।”

কুহেলি এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। দ্রুত ওয়াশরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করল। অপ্রত্যাশিতভাবে ফ্লোরে বসে পড়ল। ঠাণ্ডা টাইলসের স্পর্শে ওর বুকের জ্বালা কমল না। নিঃশব্দ কান্নায় কাঁপতে লাগল কাঁধ, অথচ শব্দ বেরোল না একটুও।

‘দুপুর দুইটার মধ্যে ওরা খাবার খেয়ে নিয়েছে। পুরো সময়টা কুহেলি অস্বাভাবিক নীরব। প্রয়োজন ছাড়া একটি শব্দও উচ্চারণ করেনি।

খাওয়া শেষ করে কুহেলি একটি বালিশ হাতে নিয়ে ফ্লোরের এক কোণে শুতে যাবে, ঠিক তখনই ইশরাক বলল,“নিচে শোয়ার প্রয়োজন নেই। খাটে এসে ঘুমান। এতে আমার কোনো সমস্যা হবে না।”

-“কুহেলি থামল। কিছুক্ষণ নীরব থেকে মৃদু স্বরে বলল, যে আমার নয়, তার পাশে শোয়া বোধহয় আমার জন্য বিলাসিতা। ডাক্তার আমায় কখনো দূরে সরিয়ে দেবেন না। ঘরের এক কোণে একটু জায়গা দিলেই হবে। সৎ মায়ের কাছে আর কখনোই ফিরতে চাই না।”

কথাগুলো বলার সময় কুহেলির কণ্ঠে ছিল না অভিযোগ, না দাবি—শুধু ছিল একরাশ ক্লান্ত অনুরোধ।

-‘ইশরাক স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। ষোল বছরের একটি মেয়ের মধ্যে এতটা পরিণত ভাব—দেখলে একদমই বোঝা যায় না। তার কথা বলার ভঙ্গি, সংযত আচরণ, নিঃশব্দ সহ্য করার ক্ষমতা—সবকিছুই অদ্ভুতভাবে মন ছুঁয়ে যায়।

এসব ভাবতে ভাবতেই কখন যে ইশরাকের চোখ জড়িয়ে এলো, টেরও পেল না। ঘরজুড়ে নেমে এলো নিঃশব্দ এক বিকেল, আর দু’জন মানুষের মাঝখানে জমে রইল অপ্রকাশিত অসংখ্য কথা।

‘কুহেলি সন্ধ্যার আগেই ঘুম থেকে উঠে নাস্তা বানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। হাতের কাজ চলছে, কিন্তু মন পড়ে আছে সেই ফ্রেমে থাকা মহিলার ছবির দিকে। বুকের ভেতর কষ্টটা যেন ধীরে ধীরে জমে শক্ত পাথর হয়ে যাচ্ছে।

এতদিন ভেবেছিল—হয়তো হঠাৎ করে বিয়ে হয়েছে বলেই মানুষটা এমন নির্লিপ্ত। সময় গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু আজ যা দেখল, তাতে কুহেলি স্পষ্ট বুঝে গেছে—উজ্জ্বল বর্ণের এই পুরুষ মানুষটা আসলে ওর নয়।

-“এসব ভাবতে ভাবতেই কুহেলি কাপে চা ঢালছিল। হঠাৎ বেখেয়ালে ফুটন্ত গরম চা এসে হাতের ওপর পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে ফোস্কা উঠে গেল। জ্বালা যেন মাংস ভেদ করে ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে, তবুও কুহেলি চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। এ ধরনের ব্যথায় ও অভ্যস্ত।

কিছুক্ষণ পর নাস্তা রেডি করে ট্রেতে সাজিয়ে রুমে ঢুকল। দেখল, ইশরাক ব্যস্ত হয়ে ল্যাপটপে কাজ করছে। চোখেমুখে বিরক্তির ছাপ—মনে হচ্ছে কোনো বিষয় নিয়ে গভীর চিন্তায় ডুবে আছে।

-“কুহেলি এসে চুপচাপ পাশে দাঁড়াল। ইশরাক আড়চোখে তাকিয়ে কপাল কুঁচকে জিঙ্গেস করল,“এভাবে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?”

কুহেলি কোনো উত্তর না দিয়ে নাস্তা বিছানার এক পাশে রাখল। তারপর ফ্লোরে হাঁটু ভেঙে বসে খেতে শুরু করল। আঁড়চোখে বারবার ওর শখা বাবুর দিকে তাকাচ্ছে।

-“ইশরাক ল্যাপটপটা সরিয়ে ঘুরে বসল। হঠাৎ ওর দৃষ্টি গিয়ে পড়ল কুহেলির হাতে। সঙ্গে সঙ্গে কণ্ঠে উত্তেজনা ফুটে উঠল,“আপনার হাতে কী হয়েছে?”

কুহেলি স্বাভাবিক ভঙ্গিতে জবাব দিল,
“সামান্য একটু পুড়ে গেছে।”

ইশরাক ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল,
“এটা সামান্য?”

কুহেলি মাথা নেড়ে ফিসফিস করে বলল,“হুম!”

-“ইশরাক দ্রুত উঠে গিয়ে ফার্স্ট এইড বক্স থেকে মলম নিয়ে এলো। খুব সতর্কভাবে কুহেলির হাত নিজের দিকে টেনে নিয়ে মলম লাগাতে শুরু করল। কুহেলি ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে ইশরাকের দিকে তাকিয়ে আছে। এই প্রথমবার ওর শখা বাবুর স্পর্শ পেল। শরীর জুড়ে অদ্ভুত এক শিহরণ বয়ে গেল। হাতের লোমগুলো খাড়া হয়ে উঠল, বুকের ভেতর কেমন অচেনা অনুভূতি জমল।

ইশরাক মৃদুস্বরে বলল,“আর কোনো কাজ করতে হবে না। আগামীকাল আমি কাজের বুয়ার ব্যবস্থা করছি।”

-“কুহেলি ধীর কণ্ঠে জবাব দিল,“সমস্যা নেই। সারাদিন বাসায় একা থাকব, তার মধ্যে কাজ না করলে খুব বোরিং লাগবে। আমি রান্নার কাজ করতে পারব। আর আপনি তো সবার হাতের রান্না খেতে পারেন না।”

ইশরাক কথাটা শুনে চুপ করে কুহেলির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। আনমনে ভাবছে—ছোট্ট মেয়েটা আমার জন্য কতটা ভাবছে। যেটা আসলে আমার নিজের করার কথা, সেটা উল্টো কুহেলিই করে চলেছে। তবে কী আমি সত্যিই মেয়েটার সঙ্গে অন্যায় করছি?

ঠিক তখনই কায়রা খানম ছেলের হোয়াটসঅ্যাপে ভিডিও কল করলেন। কুহেলি হাসিমুখে শাশুড়ির সঙ্গে কথা বলছে, আর ইশরাক পাশে বসে নিজ হাতে কুহেলিকে নাস্তা খাইয়ে দিচ্ছে।

‘ইয়াশা হঠাৎ ফোনটা টেনে নিয়ে মনখারাপ কণ্ঠে গড়গড় করে বলল,“ভাবি, তোকে ছাড়া বাড়িটা একদম ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। বড় আপু একটু আগে চলে গেছে।”

-“কুহেলি মুচকি হেসে কিছুক্ষণ কথা বলল। তারপর ফোনটা ইশরাকের দিকে বাড়িয়ে দিল। কায়রা খানম ছেলের ভালো-মন্দ খোঁজ নিচ্ছেন, আর কুহেলি মুগ্ধ চোখে ওর শখা বাবুর দিকে তাকিয়ে আছে।

বুঝ হওয়ার পর এই দ্বিতীয়বার কুহেলি কারও হাতে খাবার খাচ্ছে। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক আনন্দ জমছে। ইচ্ছে করছে, সামনে বসে থাকা মানুষটাকে একবার জড়িয়ে ধরতে। কিন্তু সেই সাহস ওর নেই। নিজের ইচ্ছেটাকে নিঃশব্দে মনের গভীরে চাপা দিয়ে দিল।
চুপচাপ বসে রইল, আর শাশুড়ির সঙ্গে কথোপকথন শেষ হওয়া পর্যন্ত নীরবে সবকিছু অনুভব করে গেল।

“রাতের নিস্তব্ধতা শুধু শব্দহীনতা নয়—এ এক ধরনের আত্মিক প্রশান্তি, যার ভেতরে লুকিয়ে থাকে অগণিত অপ্রকাশিত অনুভূতি। ব্যস্ত দিনের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি, অপূর্ণ স্বপ্ন, চাপা কান্না—সবকিছুই এই নীরবতার ভাঁজ খুলে একে একে সামনে আসে।

-“একটি গভীর রাত মানুষকে তার নিজের সঙ্গেই বসায়, প্রশ্ন করে, উত্তর খুঁজতে বাধ্য করে। কুহেলি বারান্দায় বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। সাদা চাঁদের আলো ওর মুখে এসে পড়েছে, তবু চোখে কোনো জ্যোতি নেই। জীবনের হিসাব-নিকাশ মিলাতে চাইছে, কিন্তু কোনো অঙ্কই মেলাতে পারছে না। বারবার বেডরুমের দেয়ালে ঝোলানো সেই ফ্রেমের মহিলার মুখ ওর চোখের সামনে ভেসে উঠছে। মনে পড়তেই কুহেলির বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করে বলল,“হে আল্লাহ, এত যন্ত্রণা দিও না—যেটা সহ্য করার ক্ষমতা আমার নেই। আমি প্রথম যেদিন তাকে দেখেছিলাম, মনে হয়েছিল মানুষটা একান্তই আমার হবে। তবে আজ যা দেখলাম, তার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। কলিজা ছিঁড়ে যাওয়ার মতো কষ্ট না দিয়ে, মৃত্যু দিলেই তো পারতে!”

কুহেলির চোখের কোণ বেয়ে নীরব অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। এদিকে ইশরাকের হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। অভ্যাসবশত ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে দেখে—কুহেলি নেই। বুকের ভেতর হালকা ধক করে উঠল। ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে প্রথমে রান্নাঘরের দিকে গেল। লাইট অফ। তারপর দ্রুত বারান্দার দিকে এগিয়ে এসে দেখল—কুহেলি চুপচাপ বসে আছে। পাশে দাঁড়িয়ে মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করল,“এত রাতে এখানে কেন?”

-“কুহেলি চমকে উঠল। চোখের পানি তাড়াতাড়ি হাতের উল্টো পাশ দিয়ে মুছে আমতা আমতা করে জবাব দিল, “আমার ঘুম আসছিল না। তাই এসে বসেছি।”

ইশরাক গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“এত রাতে বারান্দায় আসা যাবে না।”

কুহেলি মাথা নিচু করে প্রত্যুত্তর করল,
“স্যরি আর কখনো আসব না।”

“আচ্ছা, রুমে চলুন,” ইশরাক শান্তভাবে বলল।

রুমে ফিরে দু’জনেই শুয়ে পড়ল। ইশরাক খাটে, আর কুহেলি ফ্লোরের এক কোণে। ঘর নিস্তব্ধ, অথচ ওদের দু’জনের মনেই চলছে গভীর ভাবনার ঢেউ—দু’জন, দু’টি আলাদা মানুষকে ঘিরে, সম্পূর্ণ ভিন্ন অনুভূতি।

ইশরাক ভাবছে—কাল হাসপাতালের কাজ শেষ করে মোহিনীর সঙ্গে দেখা করবে। যেভাবেই হোক ওকে বুঝিয়ে শুনিয়ে নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা চাইবে।

অন্যদিকে কুহেলির মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে,
—”ইশরাক কী কোনোদিন সত্যিই ওর হবে?

ভোরের নরম আলো ধীরে ধীরে চারপাশ আলোকিত করে তুলেছে। নিরিবিলি স্নিগ্ধ প্রকৃতি, পাখিদের কিচিরমিচির ডাক—সব মিলিয়ে এক প্রশান্ত সকাল।

‘ফজরের নামাজ পড়ে কুহেলি কিছুক্ষণ বারান্দায় বসে সকালের মৃদু বাতাস অনুভব করল। তারপর রুমে এসে হাঁটু ভেঙে বিছানার এক পাশে বসল। গালে হাত রেখে চুপচাপ ওর শখা বাবুর ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

-”ইশরাকের গভীর নিঃশ্বাসে বুক ওঠানামা করছে। চোখের পাতা শিথিল, মুখে প্রশান্তির ছাপ। হালকা গোলাপি ঠোঁট দুটো অদ্ভুতভাবে আকর্ষণীয় লাগছে। কুহেলির খুব ইচ্ছে করল ইশরাকের এলোমেলো চুলগুলো আলতো করে ছুঁয়ে দিতে। কিন্তু নিজেকে সামলে নিল।

মুহূর্তের ভাবনাকে থামিয়ে দ্রুত উঠে দাঁড়াল। নিঃশব্দে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল—ওদের জন্য নাস্তা তৈরির কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

-“ইশরাক ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে হাসপাতালে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। রুমে কুহেলিকে না দেখে রান্নাঘরের দিকে গেল। সেখানে গিয়ে দেখল—ওড়না বুকে গুঁজে কুহেলি মন দিয়ে ঘর পরিষ্কার করছে। ছোট ছোট হাতদুটো দ্রুত কাজ করছে, মুখে অদ্ভুত এক স্থিরতা।

ইশরাক পাশে এসে শান্ত স্বরে বলল,“আপনার
সঙ্গে কিছু কথা আছে। একটু রুমে আসুন।”

‘রুমে ফিরে দু’জনের মধ্যে নীরবতা নেমে এলো। যে যার মতো নাস্তা খাচ্ছে। কুহেলি অধীর আগ্রহে নিয়ে অপেক্ষা করছে—ওর শখা বাবু কী বলবে? আবার বুকের ভেতর অকারণ ভয়—যদি চলে যেতে বলে?

অবশেষে নীরবতা ভেঙে ইশরাক বলল,
“আপনি কী আরও পড়াশোনা করতে চান?”

“কুহেলি চমকে তাকাল। তবে কিছু বলল না!

ইশরাক আবার বলল,“তাহলে আমি আপনার বাবার মাধ্যমে ট্রান্সফার সার্টিফিকেট আর বাকি কাগজপত্র এনে এখানকার কোনো স্কুলে অ্যাডমিশন করিয়ে দেব।”

‘কুহেলির মুখে সঙ্গে সঙ্গে হাসি ফুটে উঠল। চোখে যেন হালকা আলো জ্বলে উঠল। প্রফুল্লচিত্তে বলে উঠল,“আমি পড়তে চাই। আপনি ব্যবস্থা করুন।”

ইশরাক মাথা নেড়ে নাস্তা শেষ করল। বের হওয়ার সময় বারবার বলল,“কেউ এলে দরজা খুলবেন না। দুপুরের খাবার সময়মতো খেয়ে নেবেন। আমার ফিরতে সন্ধ্যা হবে।”

-“কুহেলি চুপচাপ মাথা নাড়ল। দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দে ঘরটা আবার নিঃশব্দ হয়ে গেল। এরপর বাড়ির সব কাজ গুছিয়ে ফেলল। রান্নাবান্না সেরে দুপুরে একা একাই খাবার খেয়ে নিল। তারপর অকারণে নিজেকে টেনে নিয়ে গেল বেডরুমে। বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে আনমনে দেয়ালে ঝোলানো ফ্রেমের মহিলার দিকে তাকিয়ে রইল।

মুহূর্তেই মনটা বিষাদের ছায়ায় ঢেকে গেল। বুকের ওপর হাত রেখে ধীরে ধীরে ফ্লোরের এক কোনে বসে পড়ল। নিঃশব্দে বিড়বিড় করে বলতে লাগল,“এই ছবিটা এখানে থাকলে আমার ভীষণ দুঃখ হবে। নিজেকে সামলানো বড্ড কঠিন হয়ে যাবে। আমার শখা বাবু অন্য কারোর—এটা ভাবলেই কলিজা দুমড়ে মুচড়ে যায়।”

-“কুহেলির চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে।“হে আল্লাহ, কীভাবে চাইলে সে আমার দিকে ফিরে তাকাবে—আমায় বলুন। আমি ঠিক সেভাবেই চাইব।

কুহেলি একটু থামল। তারপর আবার বলল, জীবনে আপনার কাছে কখনো কিছু চাইনি। আজ মন থেকে খুব করে চাইছি—ওই উজ্জ্বল রঙের পুরুষটাকে আমায় দিয়ে দেন। আপনি চাইলে আমায় যন্ত্রণা দিন, পিষে ফেলুন, তবুও মানুষটাকে আমায় দেন।”

কুহেলির কণ্ঠ কেঁপে উঠল।“একবার শুধু একবার তার বুকে মুখ লুকাতে চাই। তার শরীরের উষ্ণ আলিঙ্গন পেতে চাই। তার মনকাড়া পারফিউমের সুগন্ধ নিতে চাই। তাহলেই আর আমার কোনো আফসোস থাকবে না!”

-“সন্ধ্যার আগমুহূর্তে ইশরাক হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে মোহিনীর নম্বরে ডায়াল করল। কল রিসিভ হতেই ফোনের ওপাশ থেকে কান্নাজড়িত কণ্ঠ ভেসে এলো। মোহিনী ক্রুদ্ধ স্বরে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল,“প্রতারক, আমায় ঠকাল কেন?”

ইশরাক বিচলিত কণ্ঠে বলল,“তোমার সঙ্গে আমার দেখা করা খুব দরকার। শাহবাগ মোড়ের এলিফ্যান্ট রোডে আছি। আধঘণ্টার মধ্যে এসো।”

কিছুক্ষণ পর সাদা শাড়ি পরে, খোলা চুলে মোহিনী ইশরাকের সামনে এসে দাঁড়াল। চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি।

-‘বহুদিন পর প্রেমিকাকে দেখে ইশরাকের বুকের ভেতর তাকে জড়িয়ে ধরার তীব্র আকাঙ্ক্ষা জাগল, কিন্তু নিজেকে সামলে নিল। মলিন স্বরে বলল,“আমাকে ক্ষমা করো, প্লিজ।”

মোহিনী তিক্ত হেসে বলল,“তিন বছর আমার সঙ্গে সম্পর্ক রেখে আজ ষোল বছরের এক বাচ্চাসুলভ মেয়েকে বিয়ে করলে? আমার সঙ্গে প্রতারণা করে ওই মেয়েকে নিয়ে বোধহয় বেশ সুখেই আছ?”

‘ইশরাক ধীরে জবাব দিল,“আমি এমনটা কখনো চাইনি। আম্মুর কাছে হেরে গেছি। তুমি মুসলিম হলে তাদের কোনো আপত্তি ছিল না। আমাদের সম্পর্কটা টেনে নেওয়ার অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু পারিনি। তোমাকে বলেছিলাম—খ্রিস্টান ধর্ম ছেড়ে আমার সঙ্গে চলে এসো। তাহলে হয়তো আজ আমরা একসঙ্গে থাকতাম।”

মোহিনী তীক্ষ্ণ স্বরে বলল,“বাহ, এত সহজে বলে ফেললে! এমন তো কথা ছিল না। তুমি বলেছিলে পরিবারকে মানিয়ে নেবে। এখন সেই সব কোথায় গেল?”

-‘ইশরাকও শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে পাল্টা বলল, “মোহিনী, তুমিও তো বলেছিলে—পরিবার না মানলে সব ছেড়ে আমার কাছে চলে আসবে। কই, আসলে না তো? এখানে কী পুরো ভুলটা শুধু আমার ছিল?”

মোহিনী কাঁদতে কাঁদতে ইশরাককে জড়িয়ে ধরল। চোখের জল ফেলে বলল,“ইশরাক আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারছি না। খুব কষ্ট হচ্ছে। তোমার পাশে অন্য কাউকে সহ্য করতে পারছি না। তুমি ওই মেয়েকে ছেড়ে দাও। চলো, আমরা বিয়ে করে ফেলি।”

-“কথাগুলো বলার পর মোহিনীর ঠোঁটে এক অদ্ভুত, শয়তানি হাসি ফুটে উঠল। সেটা ইশরাকের আড়ালে রয়ে গেল।

ইশরাক ধীরে মোহেনিকে সরিয়ে দিয়ে শান্ত ভঙ্গিতে বলল,“আমি আজ আমাদের সম্পর্কের ইতি টানতে চাই। এরপর আর কখনোই তোমার সঙ্গে আমার দেখা হবে না। পারলে আমায় ক্ষমা করো।”

মোহিনী চোখ মুছে কাঁপা গলায় প্রত্যুত্তর করল,“তুমি আমার সঙ্গে এমনটা করতে পারো না। তোমাকে না পেলে আমি মরে যাব। তোমার ওই প্রশস্ত বুকে অন্য কোনো নারীকে আমি ঘুমাতে দেব না। তোমার শরীরের গন্ধ আমি ছাড়া কেউ নিতে পারবে না। এর পরিণতি খুব ভয়ংকর হবে, ইশরাক।”

-‘ইশরাক স্তব্ধ হয়ে মোহিনীর দিকে তাকিয়ে রইল। কী বলবে বুঝে উঠডে পারছে না। তারপর কোনো উত্তর না দিয়ে দ্রুত বাইক স্টার্ট করল। নিঃশব্দে বাসার পথে রওনা দিল—মনে জমে থাকা অজস্র দ্বন্দ্ব আর অনিশ্চয়তা নিয়ে।

-“পরবর্তী অংশ নিয়ে খুব শীঘ্রই আসব…

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x