লেখনীতে:লুনা আক্তার নূর
পর্ব:০৭
__:- শারমিন, এই শারমিন তুই কোথায়??
__:- হ্যাঁ ভাবী বলো কি হয়েছে।
__:- কি হয়েছে মানে। তোর ছেলে এখনো বাড়ি ফেরেনি আর তুই বলছিস যে কি হয়েছে।
__:- বাড়ি ফেরে নি। আছে হয়তো আশেপাশে। এতদিন পর দেশে ফিরেছে তাই হয়তো ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর ও এখন যথেষ্ট বড় হয়েছে। নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে পারে। মাকে কি আর তার প্রয়োজন পড়ে। একটু পরেই দেখো ফিরে আসবে।
__:- কিন্তু আমার তা মনে হয় না।
__:- কেনো?
__:- আরে ইভান তো সেই সকালে না খেয়ে কোথায় যেন বের হয়ে গেলো। আমি বারবার বলার পরও কিছুই খেয়ে গেলো না। দেখেই মনে হচ্ছিল যে ও অনেক রে’গে আছে। আমি আরিয়ান কে দিয়ে ওকে কল করিয়েছিলাম কিন্তু ও তো ফোন ও তুললো না। ফোন বন্ধ করে রেখেছে।
__:- চিন্তা করো না চলে আসবে। আর এমনিতেও ও যাবেই বা কোথায়। অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগেই দেখবে চলে আসবে।
মিসেস শারমিন যতই তার ভাবী কে বুলুক যে চিন্তা না করতে কিন্তু সত্যি বলতে তো এখন তার নিজেরই চিন্তা হচ্ছে তবে সে কারোর সামনে এটা প্রকাশ করছে না।
,,,,,,,,
ইতো মধ্যে হলুদের অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গিয়েছে। সন্ধায় অনুষ্ঠান করার প্ল্যান থাকলেও একজনের জন্য এই প্ল্যান টা রাতে করতে হলো। সেই একজন যে তাদের কাছে খুব স্পেশাল কেউ।
ইভান বাড়ি ফিরেছে ১০ মিনিট হবে। বাড়ি ফিরেই নিজের রুমে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দিয়েছে সে। আসলে তখন ইভানের এত রা’গ উঠেছিল যে সে যদি এখানে থাকতো তো এখন সবার দুঃখের কারণ হতো।
কারণ তার রাগ যে ক’ন্ট্রো’ল করা প্রায় অসম্ভব। তার এই রা’গ নিমেষেই সব কিছু ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ঠ। তাই তো সে বাড়ি থেকে সেই সময় বের হয়ে গিয়েছিল যাতে তার রা’গে’র জন্য কোনো অঘটন না ঘটে।
ইভান দুই হাত দিয়ে নিজের চুল খামচে ধরে মাথা নিচু করে বসে আছে। তার রা’গ কমলেও এখনো পুরোপুরি মাথা থেকে নামে নি। তখনই তার দরজায় কেউ কড়া নাড়ে। এতে ইভানের একটু বি’র’ক্ত বোধ করে।
ইভান:- কে!?
আরিয়ান:- আরে ভাই দরজা খোল আমি।
আরিয়ানই একমাত্র যার সাথে ইভান সবচেয়ে বেশি ফ্রি। তাই ইভান বেড থেকে উঠে দরজার কাছে এগিয়ে যাই আর দরজা টা খুলে দেই।
“আরিয়ান যেহেতু ইভানের সাথে ফ্রি তাহলে সে কেনো আইরার ব্যাপারে ইভান কে কিছু জানাই নি? কেনো ইভান কে আইরা কোথায় আছে সেটা জানার জন্য অন্যের সাহায্য নেওয়া লেগেছে??
আসলে মিসেস শারমিনই সবাইকে বারণ করেছিলেন ইভান কে আইরার ব্যাপারে কিছু জানাতে। মিসেস শারমিন ভেবেছিলেন যে ইভান হয়তো নওমির বিয়ে অ্যাটেন্ড করে, আইরা কে ডি’ভো’র্স দিয়ে আবার ফিরে যাবে।
যেহেতু ইভান নিজেই বলেছিল যে সে আইরা কে কখনোই নিজের স্ত্রী হিসেবে মানতে পারবে না তাই। ইভান যখন আইরা কে চিনতে পারে তখন সে আরিয়ান কে সবটাই বলে আর এটাও জিজ্ঞেস করে যে কেনো তারা সব কিছু লুকিয়েছে তার থেকে। তখন আরিয়ান, ইভান কে সবটা বলে দেই।”
আরিয়ান:- আরে তুই এখনো রেডি কেনো হোসনি?? সবাই বাগানে রেডি হয়ে চলে গিয়েছে আর তুই ঘরে দোর দিয়ে বসে আছিস।
ইভান:- আমার ভালো লাগছে না তুই যা তো এখান থেকে আমাকে একটু একা থাকতে দে।
আরিয়ান:- কি বলছিস, নওমির গায়ে হলুদ সবাই সেখানে উপস্থিত আর তুই থাকবি না। এটা কেমন দেখাই না।
ইভান:- কেমন আর দেখাবে যেমন দেখানোর তেমনই দেখাবে। তুই যা তো যা এখানে থেকে।
আরিয়ান:- ওকে চলে যাচ্ছি। তবে যাওয়ার আগে একটা কথা তোকে বলে যায়।
ইভান:- কিছুই বলা লাগবে না যা এখান থেকে।
আরিয়ান:- এই কথাটা না বললে পরে তুই আমাকে মে’রে’ই ফেলবি।
ইভান:- কি কথা!? (ভ্রু কুঁচকে)
আরিয়ান:- দীর্ঘ 6 বছর পর সায়ান খান পা রাখতে চলেছে নিজের বাড়িতে। নিজের জিনিস কে যদি নিজের করে রাখতে চাস তো রেডি হয়ে বাগানে চলে আসিস। নাহলে কে বলতে পারে তোর অবহেলায় ফেলে যাওয়া জিনিস অন্য কেউ খুব যত্নে নিজের করে নিলো।
বলেই বাঁকা হেসে আরিয়ান, ইভানের রূম থেকে বের হয়ে যায়। সায়ানের নাম শুনে ইভানের কপালে ভাঁজ পড়ে। সে ফিরে যায় তার ছোট বেলার স্মৃতিতে।
ফ্ল্যাশব্যাক……
সায়ান হলো ইভানের আরেক মামার ছেলে। ইভানের নানা রা তিন ভাই। ইভানের নানা, ইমতিয়াজ খান ছিলেন বড়। তার দুইটা সন্তান। এক মেয়ে মিসেস শারমিন রহমান আর এক ছেলে জাহিদ খান। উনার মেঝ ভাই, শওকত খান। উনার ছিল একটা ছেলে, আদনান খান। আদনান খানের একমাত্র ছেলেই হলো সায়ান খান। আর ইমতিয়াজ খানের ছোট ভাই, তৌফিক খানের একটা মেয়ে।
ছোট থেকে সায়ান ছিল খুব চঞ্চল প্রকৃতির। আর ইভান ছিল একদম তার উল্টো মানে খুব শান্ত। তবে রে’গে গেলে তাকে সামলানো দুষ্কর হয়ে ওঠে, একদম তার মায়ের মতো।
সায়ানের ছোট থেকেই ইভানের প্রতিটা জিনিসের ওপর নজর থাকতো সমবয়সী হওয়ায়। ইভান যেটাই পছন্দ করত সায়ানের ও সেটাই চাই। সে খুব একরোখা স্বভাবের। বাবা মার একমাত্র আদরের ছেলে বলে কথা।
মিসেস শারমিন, সায়ান কে একদম নিজের ছেলের মতোই ভালবাসেন। কখনো ইভান আর সায়ান কে আলাদা চোখে দেখেননি তিনি।
ইভান এর যখন ১০ বছর তখন সে 𝐂𝐚𝐧𝐚𝐝𝐚 চলে যায়। সে 𝐂𝐚𝐧𝐚𝐝𝐚 যাওয়ার জন্য মিসেস শারমিন কে ও তার সাথেই যেতে হয়। যেহেতু ইভান তখন ছোট ছিল। বলে রাখি আইরার জন্মের সময়ই কিন্তু মিসেস শারমিন 𝐂𝐚𝐧𝐚𝐝𝐚 ছিলেন।
মিসেস শারমিন, ইভানের সাথে তার ১৮ বছর হওয়া পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন। এরপর মিসেস শারমিন দেশে ফিরে আসেন। সায়ান তখন ও দেশে ছিল। যেহেতু ইভানের প্রতিটা জিনিসের ওপর সায়ানের নজর ছিল তাই সেও ছোট থেকে ইভানের মতো বিজনেসম্যান হতে চাইতো।
তবে তার বাবা তাকে বিজনেসম্যান হতে দেননি। তিনি সায়ান কে জার্মান পাঠিয়ে দেন একজন ভালো নিউরোলজিস্ট হওয়ার জন্য। সায়ান ও আর দ্বিমত করেনি কারণ সে তার বাবাকে খুব সম্মান করে।
তাই সে তার বাবার কথা রাখতেই জার্মান চলে যায় পড়াশোনা করতে। জার্মান যাওয়ার পর সে আর না এসেছে দেশে আর না কক্সবাজারে।
ফ্ল্যাশব্যাক এন্ড……
ইভান এইসবই ভাবছিল হঠাৎ করেই তার মনে পড়ে যায় যে তার একটা মূল্যবান জিনিস বাইরেই খোলা মেলা ভাবে ঘোরাফেরা করছে।
আরিয়ানের কথা মতো যদি সত্যি তার বউয়ের ওপর সায়ানের নজর পড়ে তাহলে সারাটা জীবন বিবাহিত হওয়ার সত্ত্বেও বউ ছাড়া ব্যাচেলার দের মতো জীবন অতিবাহিত করতে হবে তাকে।
এমনিতেই তার বউ যা সুন্দর তাতে যে কারোরই নজর কাড়বে।
ইভান:- না না ইভান নিজের জিনিস যদি ঐ সায়ানের থেকে বাঁচাতে চাস তো তোকে ঐখানে যেতেই হবে।
বলেই ইভান তাড়াতাড়ি করে রেডি হয়ে বাগানে দিকে হাটা দেই যেখানে এখন নওমির হলুদের অনুষ্ঠান চলছে।
,,,,,,,,,,,
আইরা কালকের মতো আজকেও চুপ করে একটা কর্নারে বসে আছে। তবে আজকে তার সাথে মিসেস শারমিন আছেন। মিসেস শারমিন বার বার নিজের ফোনের দিকে তাকাচ্ছেন।
__:- আম্মু….
হঠাৎই পরিচিত কন্ঠ কানে আসতেই ঘড়ি থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সামনে দাড়িয়ে থাকা মানুষটির ওপর দৃষ্টি পাত করেন মিসেস শারমিন। এরপর উঠে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরেন।
__:- বাবা তুই কেমন আছিস। আম্মু কে তো একেবারে ভুলেই গিয়েছিস।
__:- তোমাকে কিভাবে ভুলতে পারি আম্মু। তুমি তো আমার দ্বিতীয় মা।
__:- দাড়া তোর মম কে ডাকি। ভাবী ভাবী কোথায় তুমি। দেখো তোমার ছেলে এসেছে এতদিন পর।
মিসেস শারমিনের ডাক শুনে সায়ানের মা মিসেস সাবরিনা খান ছুট্টে আসেন। উনি এসে সায়ান কে জ’ড়ি’য়ে ধরে কান্না করে দেন। অনেক দিনপর একমাত্র ছেলে বাড়ি ফিরেছে।
তিনি ছেলের মুখে চু’মু’তে ভরিয়ে দেন। কাঁদতে কাঁদতে বলেন,
__:- কতদিন পর আমার ছেলেটাকে দেখছি। মমের কথা বুঝি মনে পড়ে না।
সায়ান:- মম তুমি কান্না করছ কেনো। এতদিন পর তোমার বেটা দেশে ফিরেছে একটু হাসো।
সায়ানের কথা শুনে ওর মিসেস সাবরিনা কান্না থামিয়ে দেন আর বলেন,
__:- আমি আর কাঁদবো না। কিন্তু বেটা তুই কেনো এতদিন দেশে আসিসনি। মমের কথা কি এতদিনে একবারও মনে পড়েনি।
সায়ান:- মম কাজের প্রেসার ছিল অনেক, তাইতো দেশে আসতে পারিনি। ওকে মম তুমি কি এখন আমাকে নিয়েই ব্যস্ত থাকবে। নওমির বিয়ে উপলক্ষে এসেছি তোমরা ওকে পাত্তা না দিয়ে আমাকে নিয়েই পড়ে আছো।
__:- হ্যাঁ হ্যাঁ ভাবী সায়ান তো ঠিক কথাই বলেছে। আচ্ছা সায়ান যা বাবা রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নে। ভাবী চলো আমরা বরং ঐদিকে যায়। অনুষ্ঠান তো শুরু হতে চলল।
__:- হ্যাঁ চলো।
বলেই উনারা চলে যান। সায়ান নিজের রুমের দিকে যেতে নেয় তবে সে থেমে যায়। পিছে মুড়ে ভেজা চোখে একবার নওমির দিকে তাকাই। নওমি কে আজকে খুব খুশি খুশি লাগছে। আর খুশি তো লাগারই কথা। নিজের পছন্দের মানুষের সাথে যে তার জীবন জুড়ছে।
সায়ান ঠোঁ’টের কোণে একটা চাপা যন্ত্রণা লুকানো হাসি নিয়েই পা বাড়ায় রুমের দিকে। সে আর কোনো পিছুটান রাখতে চাই না। আর পিছনে ফিরে দেখতে চাইনা তার ভালোবাসার মানুষটিকে। কারণ তাকে দেখলেই পুরনো চাপা ক’ষ্ট গুলো আবার জেগে উঠবে।
অনেক ক’ষ্ট বুকে নিয়েই সে দেশে ফিরেছে। এই কয়দিন যে তার ওপর দিয়ে কি গিয়েছে সেটা শুধু সেই জানে। ছোট থেকেই সায়ান, নাওমি কে পছন্দ করত। বড় হতে হতে সেই পছন্দ রূপ নেয় ভালোবাসায়।
সে নিজের এই ভালোবাসা নওমির সামনে প্রকাশ করার আগেই তার বাবা তাকে জার্মান পাঠিয়ে দেন পড়াশোনার জন্য। সে ভেবেছিল পড়াশোনা শেষ করে নওমির ব্যাপারে বাবা মাকে জানাবে।
তবে একসপ্তাহ আগে তার আম্মু মানে মিসেস শারমিন (সায়ান, মিসেস শারমিন মানে তার ফুপু কে ভালবেসে আম্মু বলে ডাকে ) তাকে ফোন করে জানান যে নওমির বিয়ে ঠিক হয়ে গিয়েছে। নওমির বিয়ে ঠিক হয়েছে এটা শোনার জন্য সায়ান একদমই প্রস্তুত ছিল না। তার গলা দিয়ে একটা কথাও বের হচ্ছিল না।
তার ভালোবাসার মানুষ কিছুদিন পর অন্য কারোর হয়ে যাবে এটা শুনেই যেনো তার বুকটা ভারী হয়ে ওঠে। তবুও নিজেকে অনেক সামলানোর চেষ্টা করেছে।
সে আসতেই চাইছিল না। কিন্তু মিসেস শারমিনের জোরাজুরিতে সে আসতে বাধ্য হয়। সবাই এখানে হাসি খুশি অথচ সে। সে কতটা হতভাগা যে নিজের চোখের সামনেই নিজের ভালোবাসার মানুষটি অন্য কারো হয়ে যাবে আর সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখবে।
চলবে……
সবাই একটা করে কমেন্ট করে যাবেন😊😊😊