গল্প: রাগে অনুরাগের(১৫)

লেখিকা-জান্নাতুল ফারিয়া প্রত্যাশা

১৫.
~
তনিমা কিছুটা সুস্থ হতেই পরদিন বিকেলে ফায়াজ, তনিমা আর ফিহাকে নিয়ে নিজের বাড়িতে চলে আসল। কালকে পুরোটা দিন তনিমার মন খারাপ ছিল। মা, বাবা, ভাইকে ছেড়ে আসতে কষ্ট হচ্ছিলো যে। ফায়াজকে বলেছিল আর কিছুদিন থাকার কথা। কিন্তু ফায়াজ তার কাজের অযুহাত আর তনিমাকে সাজেকে যাওয়ার লোভ দেখিয়ে নিয়ে এসেছে। আজ সকালের ঘুম ভাঙতেই তনিমা নিচ থেকে কারোর চেঁচা মেচির শব্দ শুনতে পেল। দৌঁড় নিচে নামল সে। গিয়ে দেখে শেফালী খাতুন তার মেয়ে সাফাকে খুব বকছে। তনিমা জেঠীমার কাছে গিয়ে ‘কি হয়েছে’ জিগ্যেস করতেই উনি যেন আরো জ্বলে উঠলেন,

‘এসেছেন আরেক নওয়াবজাদী। বাপের বাড়ি গিয়ে অসুখ বাদিয়ে এসে এখন শুধু উনার আরাম আর আরাম। এ নাকি আবার বাড়ির বউ। এর থেকে দেখেই আমার মেয়েটা এসব শিখছে। যতসব ন্যাকামো, একটু কিছু হলেই গলে যায়। যেন ননির পুতুল উনি!’

তনিমার কষ্ট লাগল। হঠাৎ ভীষণ কান্না পাচ্ছে তার। কি এমন করেছে সে, যে জেঠীমা তাকে সব সময় এত কথা শুনায়? তনিমার দুঃখি দুঃখি মুখটা দেখে সাফা বললো,

‘মা, ভাবিকে কেন অযথা বকছো? ভাবি তো..’

‘চুপ একদম চুপ।(চেঁচিয়ে উঠেন তিনি), আসছে ভাবির ননদিনী ভাবির সাফাই গাইতে। হয়েছো তত পুরো ভাবির মতো। কিভাবে কাজে ফাঁকি দেওয়া যায় সেই ধান্দাতেই তো থাকো দুজন। ফাঁকিবাজ কোথাকার!’

তনিমার চোখ ভিজে উঠল। খুব কষ্ট করে নিজেকে দমিয়ে রেখেছে। হাত মুষ্টি করে বার বার ঢোক গিলছে।

জেঠীমা আরো কিছুক্ষণ রাগ দেখালেন। কর্কশ গলায় তনিমাকে বেশ কিছুক্ষণ কথা শোনালেন। তারপর মেয়েকে টেনে হিছরে নিজের সাথে রুমে নিয়ে গিয়ে দরজা আটকে দিলেন। তনিমা টলমল চোখ জোড়া ওড়নাটা দিয়ে মুছে নিল। তারপর ছোট্ট একটা শ্বাস নিয়ে সিঁড়ির দিকে ঘুরতেই তার শ্বাশুরিকে দেখল। উনি বিষন্ন চোখে চেয়ে আছে তার দিকে। রিনা রহমান এগিয়ে এসে তনিমাকে জড়িয়ে ধরলেন। তারপর গম্ভীর সুরে বললেন,

‘উনি তোর উপর আগে থেকেই রেগে ছিলেন তনু। তাই এখন রাগটা দেখিয়েছে। উনার ভাষ্যমতে বাড়ির বউদের অসুস্থ হওয়ার অযুহাতে রুমে বসে থাকা চলবে না। তাদেরকে অলঅয়েজ এক্টিভ থাকতে হবে। আসার পর থেকেই উনি তোকে খেয়াল করেছেন। প্রায় অনেকটা সময়ই তুই রুমে ছিলি। তাই উনার এত রাগ জমেছে। আমি জানি তোর শরীরের অবস্থা কিন্তু এই মানুষটা বোঝে না রে। আমার সময়ও এমন করেছে। কি করবো বল? তোদের বাবা উনাকে কিছু বলতে বারণ করেছেন। উনি যা খুশি তাই করবে আমরা নাকি কিছু বলতে পারবো না। তাই এখন ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও আমাদের সবটা মুখ বুঝে মেনে নিতে হচ্ছে।’

তনিমা কিছুক্ষণ থম মেরে দাঁড়িয়ে থেকে বললো,

‘মা, বাবা কবে দেশে ফিরবে বলতো? কবে ফিরবে? নিজের একমাত্র ছেলের বিয়েতে উনি আসেননি, কেন মা? উনার কি আমাকে পছন্দ হয়নি? সেই কবে উনি ইতালি গিয়েছিলেন অথচ এখনও ফিরলেন না। উনি ঐ দেশে বসে কিভাবে বুঝবেন জেঠীমা কি করছেন না করছেন? জেঠীমা উনাকে ফোন করে যা বলে উনি তাই বোঝেন। উনাকে বলো মা, এবার যেন উনি ফিরে আসে। আর কত বাইরে বাইরে থাকবে বলতো?’

রিনা রহমানের গাল বেয়ে দু ফোটা স্বচ্ছ জল গড়িয়ে পড়ল। এ আর নতুন কি! স্বামীর অনুপস্থিতিটা যে বড্ড কষ্ট দেয় উনাকে। কত রাত যে স্বামীর স্মৃতিচারণ করে এইভাবে চোখের জল ফেলেছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। তাও যদি তার স্বামী বুঝতো তার কষ্ট খানা!

তনিমা রুমে এসে ধপ করে বিছানায় শুয়ে পড়ল। মাথাটা ধরেছে তার। চোখ বন্ধ করতেই পেটের উপর কারোর হাতের স্পর্শ পেল। এক ঝটকায় ফায়াজের হাতটা সরিয়ে দিল সে। ফায়াজ আবারও হাতটা রাখতেই তনু এবার রেগে গেল। রাগ দেখিয়ে বললো,

‘ভাল লাগছে না ফায়াজ। হাত সরাও।’

ফায়াজ হাত সরালো না। তনু রাগে ফায়াজের হাতটা খামছে ধরলো। তাও ফায়াজের মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া এলো না। তনু এবার ভীষণ ভাবে ক্ষেপে গেল। চেঁচিয়ে উঠে বললো,

‘সমস্যাটা কি তোর? শুনতে পাচ্ছিস না কি বলছি? গায়ে হাত দিবি না একদম।’

ফায়াজ এবার নড়েচড়ে উঠল। ঘুমঘুম কন্ঠে বললো,

‘এই রাগটা জেঠীমার সাথে দেখালে জেঠীমা তখন আর এত কিছু বলার সাহসটা পেত না।’

তনিমা কিছুটা অবাক হয়ে বললো,

‘তুমি জেঠীমার কথা শুনেছিলে?’

‘হুম।’

তনিমার এবার মন খারাপ হলো। ফায়াজ সবকিছু শুনেও একবার প্রতিবাদ করতে গেল না! তাকে যে এত কথা শুনালো তাতে কি ওর একটুও কষ্ট লাগেনি? ও তো একটু নিচে যেতে পারতো, আর কিছু পারুক না পারুক অন্তত তার হয়ে কিছু তো বলতে পারতো। তনিমা রাগ করে শোয়া থেকে উঠে সোজা বারান্দায় চলে গেল। রাতে বৃষ্টি হয়েছিল। এখন রোদের সোনালী আলোয় আশে পাশের গাছের পাতাগুলো চকচক করছে। বাড়ির সামনের রাস্তাটা এখন ব্যস্ত সড়ক। কত ছোট বড় গাড়ি ছুটে চলছে তাদের গন্তব্যের দিক! তনিমার অভিমানী চোখ জোড়া এদিক ওদিক ব্যস্ত ভঙিতে ছুটে যাচ্ছে। সে কি দেখছে, কি খুঁজছে তা নিজেও জানে না। চোখ আটকে গেল। চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হলো। রাস্তার ওপারের স্কুল গেইটের বাইরে একটা ছেলে আর মেয়ে। আন্দাজে হয়তো এইট নাইনে পড়ে। মেয়েটা যেন কি বলে ছেলেটাকে খুব শাসাচ্ছে। আর ছেলেটা মাথা নিচু করে সব শুনে যাচ্ছে। তনুর অধর প্রসারিত হলো। থুতনির কালো তিলটা জ্বল জ্বল করে উঠল। এই তো সেই ছোট্ট তনু আর ফায়াজ। আর তাদের সেই দুষ্টু মিষ্টি সম্পর্ক। তনু আনমনেই হাসল। এইভাবে যে সেও কত ফায়াজকে শাসন করেছে..

রুমে এলো তনু। ফায়াজ বুক পেট নিচে দিয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে। তনিমা মুচকি হেসে ফায়াজের পিঠের তার মাথা রেখে ফায়াজকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়ল। অনেকটা সময় সে ঐ ভাবেই শুয়ে রইল। ফায়াজ এবার একটু নড়ল। তারপর মিহি কন্ঠে বললো,

‘আমার অভিমানী পাখির অভিমান কমেছে তাহলে?’

তনু উত্তর দিল না। চুপচাপ শুয়ে রইল। ফায়াজ আবারও বললো,

‘কাল জেঠীমা চলে যাবেন। তারপর তোমার আর কোনো সমস্যা হবে না, তনু।’

তনু এবারও কোনো উত্তর দিল না। ফায়াজ বললো,

‘জেঠীমা চলে গেলেই আমরা সাজেক যাবো কেমন?’

তনু এবার মুখ খুললো; বললো,

‘আমাদের ছুটি শেষ হতে চললো। বস আর ছুটি দিবেন না।’

‘চিন্তা করিও না আমি ম্যানেজ করে নিবো।’

ফায়াজের কথায় তনিমা মুচকি হেসে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো তাকে।
.

সকালের নাস্তার টেবিলে সকলে বসলেও জেঠীমা বসলেন না। উনি নাস্তা করবেন না বলে সোজা নিজের রুমে গিয়ে দোর দিলেন। কেউ তাকে সাধল না। এবার সবাই বিরক্ত। আর কত সহ্য করবে এইসব? সবাই নাস্তা করে যার যার কাজে চলে গেল। তনিমা তার শ্বাশুরির পেছন পেছন রান্নাঘরে গেল। তারপর চিন্তিত কন্ঠে বললো,

‘মা, জেঠীমা কিছু খেলেন না কেন? উনি কি এখনও আমার উপর রেগে আছেন?’

‘জানি না রে মা। উনি কখন কার উপর রেগে থাকেন সেটা একমাত্র উনিই জানেন। আমি যাবো এখন খাবার নিয়ে উনার রুমে। বাচ্চাদের মতো আদর করে করে উনার রাগ ভাঙাতে হবে, বুঝেছিস? নয়তো উনি কিচ্ছু মুখে তুলবেন না।’

তনিমা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো,

‘মা, খাবারটা আমি নিয়ে যাই?’

‘না না। তোকে দেখলে উনি আরো বেশি রেগে যাবেন। বুঝিস না কেন উনি তো এমনিতেই তোর উপর রেগে আছেন।’

তনিমা তার শ্বাশুড়িকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে খাবারের প্লেট নিয়ে জেঠীমার রুমের কাছে গেল। তারপর বুকে দুইটা ফুঁ দিয়ে দরজায় নক করলো..

চলবে..

0 0 votes
Article Rating
Loading spinner
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x