Golpo:Ek Chilte Sukher Asha(05)

পর্ব সংখ্যা [৫]

কলিং বেলের আওয়াজে কুহেলি মন্থর গতিতে উঠে দরজা খুলল। ইশরাককে দেখে স্বস্তি পেলো। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, “আসতে এত দেরি হলো যে?”

-”ইশরাক কোনো প্রত্যুত্তর না দিয়ে, মুখে নিরানন্দ ও গম্ভীরতার ছাপ রেখে হনহনিয়ে রুমে ঢুকে পড়ল। দ্রুত পোশাক পাল্টে ওয়াশরুমে ফ্রেশ হতে গেলো। কুহেলি কিছুটা আশ্চর্য হয়ে দেখছে, আজ ইশরাক কেন এমন আচরণ করছে। তারপর চুপচাপ রুমে দাঁড়িয়ে রইল, বিষন্ন মনে ভাবছে, আজ আবার মহোদয়ের কী হলো? এসেই এভাবে নিঃশব্দে চলে গেল কেন?

“কিছুক্ষণের মধ্যে ইশরাক ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলো। কুহেলির দিকে এক নজর দৃষ্টিনন্দন করে ভারি কণ্ঠে বলল, “আমি বাইরে থেকে খাবার খেয়ে এসেছি, এখন রেস্ট দরকার। কোনো রকমের বিরক্ত করবেন না।”

তারপর সটানভাবে বিছানায় গা এলিয়ে চোখ বন্ধ করে নিয়েছে। মাথার ভেতরে হাজারও দুশ্চিন্তা, ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত।

-“কুহেলি স্তব্ধ হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল, বুকটা অদ্ভুতভাবে হুহু করছে। শব্দহীনভাবে রুমের লাইট বন্ধ করে এসে ফ্লোরে শুইয়ে পড়ল। আজকে কুহেলির মা-কে ভীষণ মনে পড়ছে। চোখ থেকে দু’ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে নামল, কুহেলি বাম হাতের উল্টো পাশে মুছে নিল। একা একা নিজেকে বলল, “কেঁদে কী হবে কুহেলি?”

‘তোর এই কান্না দেখে কারও মনে মায়া জন্মায় না। জন্মের পর মা স্বার্থপরের মতো এই কঠিন দুনিয়ায় একা ফেলে রেখে চলে গেছে, তোর জন্য তারও মায়া হয়নি। বাকিদের হবে—এটা আশা করা বোকামি ছাড়া কিছুই নয়!

-“আজ কুহেলি নিজেকে দমাতে পারছে না। না চাইতেও চোখ থেকে অঝোরে জল গড়িয়ে পড়ছে। কুহেলি বুকে হাত রেখে বিড়বিড় করে বলছে,“আল্লাহ, আমাকে একটা ভয়ংকর অসুখ দাও। যেটা থেকে আর কখনোই সুস্থ হওয়া যাবে না। সোজা মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেবে। আমাকে খুব যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু দাও।” তাও এমন জীবন থেকে মুক্তি দাও।

রাত যত গভীর হচ্ছে, কুহেলির জ্বর ততই বাড়ছে। শরীর থরথর করে কাঁপছে, ভীষণ ঠান্ডা অনুভব করছে।

‘হঠাৎ দুঃস্বপ্ন দেখে ইশরাকের ঘুম ভেঙে গেল। ফ্লোর থেকে হাহাকার ধ্বনি শুনে আশ্চর্য হয়ে কাছে এলো। কুহেলির উর্ধ্ববাহু স্পর্শ করতেই কেঁপে উঠল। কপালে হাত রাখতেই বুঝল, জ্বরে শরীর পুড়ে যাচ্ছে। দ্রুত থার্মোমিটার এনে জ্বর মেপে দেখল—১০৩° ডিগ্রি।

-”অতঃপর ইশরাক হালকা ফল খাইয়ে ওষুধ দিল। তারপর চিন্তিত ভঙ্গিতে বসে কুহেলির মাথায় জলপট্টি দিতে লাগল।

বিষাদময় সকাল নেমে এলো। মনখারাপ আর হতাশার ভারে দিনটা শুরু হলো। দিনের আলো থাকলেও কুহেলির কাছে সবকিছু যেন নিস্তেজ, নির্জীব লাগছে।

কুহেলির গায়ে এখনও হালকা জ্বর। সকালে শরীর খুব দুর্বল আর ম্যাজম্যাজে লাগছিল বলে ঘুম থেকে উঠতে পারেনি। প্রতিটি মাংসপেশীতে তীব্র ব্যথা, আর ক্লান্তি স্পষ্ট। শীত লাগার পাশাপাশি শরীরের তাপমাত্রাও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি।

“ইশরাক তাড়াহুড়ো করে উঠে ফ্রেশ হয়ে নাস্তা নিয়ে এলো। খাবার নিয়ে কুহেলির পাশে বসতেই ধীর কণ্ঠে বলল,“আমি পরে খেয়ে নেব। আপনার দেরি হয়ে যাচ্ছে, চলে যান।”

ইশরাক কোনো কথা না শুনে একপ্রকার জোর করেই খাবার মুখে তুলে দিল। তারপর নিজে খেয়ে কুহেলিকে ওষুধ খাইয়ে রেডি হয়ে বের হতে লাগল। বারবার বলে গেল,“রান্না করার দরকার নেই। দুপুরে আমি খাবার নিয়ে আসব।”

ইশরাক চলে যাওয়ার পর কুহেলি বারান্দায় মেঝেতে বসে ভীষণ মনোযোগ দিয়ে সামনের পরিত্যক্ত বিল্ডিংটির দিকে তাকিয়ে আছে। ওখানে এখনও লাইট জ্বলছে।

‘অনেকক্ষণ প্রতীক্ষার পর অবশেষে দেখা গেল—বৃদ্ধ বয়সী এক লোক লাঠিতে ভর করে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বাড়ির ভিতরে ঢুকছে। লাইট বন্ধ হয়েছে আধঘন্টা হলো, কিন্তু বাড়ি থেকে কেউ বের হচ্ছে না। কুহেলি অধীর আগ্রহে বসে আছে, প্রতিটি নড়াচড়া চোখে রাখছে। লোকটি কখন বের হবে, তা জানার আগ্রহ ওর মনে উত্তেজনা সৃষ্টি করছে। দেড় ঘন্টা কেটে গেছে। কুহেলি এবার বিরক্ত হলো। ওর ধৈর্য কমে গেছে। তবে বাড়িটির প্রতি আগ্রহ আরও বেড়ে গেছে। ঠিক কি ঘটছে সেখানে, সেটা দেখার জন্য মন আঁকুপাঁকু করছে।

-“ইশরাক হসপিটালে ব্যস্ত, পেশেন্ট দেখছে, তবু বারবার কেন যেন কুহেলির কথা মনে পড়ছে। ভাবছে—জ্বর কমেছে নাকি বেড়েছে। দ্রুত কাজ শেষ করে হসপিটাল থেকে বেরিয়ে এলো।

‘ইশরাক আগেই ফোনে আনিস উদ্দিনের সঙ্গে কথা বলে রেখেছে। কুরিয়ার মাধ্যমে কুহেলির ছাড়পত্র (ট্রান্সফার সার্টিফিকেট), নতুন স্কুলে ভর্তি সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, নির্দিষ্ট শ্রেণিতে ভর্তির জন্য বয়স ও শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রমাণপত্র—যেমন পূর্ববর্তী স্কুলের রিপোর্ট কার্ড (মার্কশিট)—সব পাঠিয়ে দিয়েছে।

-“ইশরাক কুরিয়ার থেকে জিনিসপত্র রিসিভ করে, মোবাইল শপে গিয়ে কুহেলির জন্য একটি অ্যান্ড্রয়েড ফোনও কিনেছে। তারপর খাবার নিয়ে বিকেল চারটার মধ্যে বাসায় ফিরে এসেছে।

কুহেলির শরীরের অবস্থা ভীষণ খারাপ। সারাদিন ধরে শুধু হাসফাস করছে, গা ব্যথা আর মাথা ব্যথায় যেন পাগলের মতো কেঁপে উঠছে। ফ্লোরে শুয়ে শুধু গুঞ্জন করছে। এত তীব্র মাথা ব্যথা কুহেলি এর আগে কখনো অনুভব করেনি।

“কুহেলি কলিং বেলের আওয়াজ শুনে নিজেকে সামলাতে চেষ্টা করে ধীরে ধীরে এগোতে শুরু করে। দরজা খুলতেই মাথা ঘুরে ফ্লোরে পড়ে যায়।

-“ইশরাক হন্তদন্ত হয়ে কাছে এগিয়ে এসে দেখে কুহেলির শরীরে জ্বালাময় জ্বর। তাড়াহুড়ো করে ওকে কোলে তুলে রুমে নিয়ে এলো। বিছানায় শুইয়ে জ্বর মেপে দেখল ১০৪ ডিগ্রি।

এবার ইশরাক কুহেলিকে মৃদুস্বরে
ডাকল, “এই যে শুনছেন?”

কুহেলি পিটপিট করে চোখ খুলে নিজেকে বিছানায় আবিষ্কার করল। ধড়ফড়ে উঠে বসে, অবাক চোখে সামনে বসে থাকা ইশরাককে দেখছে।

-“ইশরাক কুহেলির হাত ধরে রুষ্টস্বরে বলে উঠল, বিছানা থেকে এক পা-ও নামবেন না। তাহলে কিন্তু খুব খারাপ হবে। সারাদিন ধরে না খেয়ে আছেন। চলুন! খাবার খান, এখনই ডাক্তারের কাছে যাব।”

কুহেলি মিনমিন করে জিজ্ঞেস করল, “আপনি
তো নিজেই ডাক্তার। আবার যেতে হবে কেন?”

‘ইশরাক সজাগভাবে উত্তর দিল, “আমি মেডিসিন বিশেষজ্ঞ নই, অর্থোপেডিক সার্জন। কিন্তু আপনার শরীরে জ্বর ১০৪°—দেরি করা যাবে না।”

কুহেলি মাথা নিচু করে পুনরায় বলল, “ডাক্তার, আপনি পাশে থাকলেই আমার সমস্ত অসুখ সেরে যাবে। কোথাও যেতে হবে না। আমার দেহে উঠে দাঁড়ানোর মতো শক্তি অবশিষ্ট নেই।”

-“ইশরাক হতবাক হয়ে রইল। কুহেলির মুখের দিকে স্তব্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে—কী বলবে তা জানে না। মাথা নিচু করে নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে।

হঠাৎ কুহেলি মাথায় হাত রেখে যন্ত্রণায় কাতর হয়ে বিলাপ করতে লাগল। মুখখানা কুঁচকে মৃদুস্বরে বলল, “ডাক্তার আমায় একটু বুকে বুকে জড়িয়ে নিবেন  প্লিজ! মাথায় ভীষণ যন্ত্রণা হচ্ছে, আর সহ্য করতে পারছি না।”

ইশরাক ধীর গতিতে কাছে বসতেই, কুহেলি ঝাপিয়ে পড়ল ইশরাকের বুকের দিকে। কুহেলি এই প্রথমবার মানুষটার বুকে ঠাঁই পেল, শরীরের গন্ধ পেয়েছে, এবং দৃঢ়ভাবে আলিঙ্গন করছে—যেন ছেড়ে দিলে পালিয়ে যাবে। কুহেলি চোখ বন্ধ করে নিজেকে সুখী মানুষের তালিকায় রেখে বিড়বিড় করছে।

‘ইশরাক কিছুই বলল না, শুধুই নিশ্চুপ হয়ে শুনছে। কুহেলির কথা শুনে ওর বুকে চিনচিন ব্যথা অনুভব হচ্ছে—নিজেকে যেন পাপিষ্ঠ পুরুষ হিসেবে ধরে নিয়েছে।

-“রাত যখন গভীর হলো, চারপাশে নিস্তব্ধতা নেমে এলো। দুঃখ, অতীতের স্মৃতি, বর্তমানের অনিশ্চয়তা আর ভবিষ্যতের ভয়—সব মিলে এক অচেনা যন্ত্রণা সৃষ্টি করছে। এখন রাত প্রায় বারোটা বাজে। ইশরাক কুহেলিকে বুকে জড়িয়ে শুয়ে আছে। মেয়েটি শিশুর মতো গভীর ঘুমে। দেখতে ভীষণ কোমল, মায়াবী—ঘুমন্ত মুখের সৌন্দর্য শব্দে প্রকাশ করা যাবে না।

চাঁদের আলোর ঝলকানি পড়ে কুহেলির চেহারায় যেন আরও হাজার গুন লাবণ্য যোগ করেছে। ইশরাক হাত বাড়িয়ে আলতো স্পর্শে ওর গাল ধরে স্লাইড করছে। ঠোঁট ছুঁইয়ে কপালে পড়ে থাকা চুলগুলো কানে গুঁজে দিয়েছে। শক্ত করে বুকে আলিঙ্গন করে মনে মনপ প্রতিজ্ঞা করল—আমি সমস্ত অতীত ভুলে যাব, এই বাচ্চা মেয়েটিকে নিয়েই বাকি জীবন কাটাব। আর আমার হৃদয়ে মোহিনীর কোনো অস্তিত্ব রাখব না।

‘সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে চারপাশে ধীরে ধীরে আলোর স্নিগ্ধ আভা ছড়িয়ে পড়ে, যা এক মনোরম দৃশ্যের সৃষ্টি করে। প্রকৃতির গাছপালা সতেজ, পাখির ডাকে চারপাশ মুখর। ভোরের হালকা বাতাসে মনও প্রশান্তি পায়।

-“ভোর সাতটা বাজে, কুহেলির ঘুম ভেঙেছে। প্রায় পনেরো ঘণ্টা গভীর ঘুমে থাকার পর পিটপিট করে চোখ খুলে নিজেকে ইশরাকের বুকে আবিষ্কার করল। অবাক হয়ে কিছু দূরে সরে ঘুমন্ত মানুষটার মুখের দিকে তাকাল। ইশরাকের চোখের পাতা এখন অর্ধ খোলা, গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। কুহেলি ধীরে ধীরে ইশরাকের কপাল থেকে মাথার চুল সরিয়ে প্রফুল্লচিত্তে তাকিয়ে রইল।

অল্পক্ষণ পর কুহেলি কাছে এসে ইশরাকের কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিতে চাইল। ঠিক তখনি ইশরাকের ঘুম হালকা হলো। ইশরাক কুহেলিকে থামিয়ে দিয়ে পুনঃ আষ্টেপৃষ্টে বুকে জড়িয়ে নিল। কানের কাছে মুখ রেখে ঘুম জড়ানো কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল,“এখন কোথাও যাবেন না। এভাবেই আমার সঙ্গে মিশে থাকুন, নাস্তা বাইরে থেকে নিয়ে আসব।”

-“কুহেলি অবাক হয়ে শুয়ে রইল—মানুষটা হঠাৎ কীভাবে এমন আন্তরিকভাবে অন্তরে আশ্লেষ করছে। ছোট্ট হৃদয় প্রকম্পিত, উথাল-পাথাল, মনে হচ্ছে হৃৎপিণ্ডে ঝড় চলছে। ইশরাকের গভীর নিঃশ্বাস আর বুক ওঠা-নামার শব্দ স্পষ্ট টের পাচ্ছে। মনেমনে বিড়বিড় করছে—“তবে কী শখা বাবু শুধুই আমার হবে?”

প্রায় এক ঘন্টা পর ইশরাকের ঘুম পুরোপুরি ভাঙল। চোখ খুলে কুহেলিকে দেখে মৃদু হাসল, কপালে হাত রেখে জ্বর চেক করল। মুখে হাত বুলিয়ে নরম কণ্ঠে জিঙ্গেস করল, “এখন কী আপনি ঠিক আছেন?”

কুহেলি প্রত্যুত্তর না করে, লাজুক ভঙ্গিতে দৃষ্টি রেখে কাঁপা-কাঁপা স্বরে পাল্টা প্রশ্ন করল, “আজকে কী আপনি হসপিটালে যাবেন না?”

-“ইশরাক মৃদুহেসে জবাব দিল,“আজ যাব না। আপনাকে স্কুলে ভর্তি করাতে নিয়ে যাব। আরও কিছু প্রয়োজনীয় কাজ বাকি আছে। উঠে গোসল করে ফ্রেশ হয়ে নিন, আমি নাস্তা নিয়ে আসি।”

-“কুহেলি স্তব্ধ হয়ে রইল, খুশিতে আত্মহারা। চোখ ছলছল করছে—কেন কান্না পাচ্ছে নিজেও বুঝে উঠতে পারছে না। চোখের নোনা জ্বল আড়াল করার চেষ্টা করলেও তা সম্ভব হলো না। কার্নিশ গড়িয়ে দু’ফোটা জল নেমে এলো।

ইশরাক কুহেলিকে বালিশে শুইয়ে দিয়ে উপরে চলে এলো। চোখের পানি মুছে দিয়ে মৃদুস্বরে বলল, “কুহু, কান্না থামান। এতদিন তো অনেক কাঁদলেন, আর আপনার বিষাদমাখা মুখটা আমি দেখতে চাই না।”

-“কুহেলি বিস্মিত হয়ে গেল—কারণ এই নামে কেউ ওকে কখনো ডাকেনি। হৃদয় কম্পিত হলো, শরীরও ঝাঁকুনি দিল। শীতল চাহনিতে ওর শখা বাবুর দিকে চেয়ে রইল।

ইশরাকের কথায় কুহেলির ধ্যান ফিরল। “আপনাকে আর কাঁদতে দিব না। আমাকে ক্ষমা করবেন, প্লিজ। আসার পর থেকে অনেক কষ্ট দিয়েছি। এখন থেকে নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে আপনাকে আগলে রাখব। পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো স্বামী হয়ে দেখাব।”

-“কুহেলি ইশরাককে কাছে টেনে বুকে মাথা রেখে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। আজকের কান্না দুঃখের নয়—এটি প্রাপ্তির কান্না, আনন্দের কান্না। ইশরাক কুহলির চোখের জল মুছে দিয়ে, ঠোঁট ছুঁইয়ে, কপালে ও গালে আলতো করে চুমু দিয়ে মৃদুস্বরে বলল,“এখন কী মাথা ব্যথা করছে?”

-“কুহেলি মাথা নাড়িয়ে না সূচক উত্তর দিল।

কুহেলি উঠে গোসল করে ফ্রেশ হয়েছে। ইশরাক নাস্তা নিয়ে এসেছে। নিজে খাচ্ছে, পাশাপাশি কুহেলিকে খাইয়ে দিচ্ছে। এরপর নতুন ফোন রেডি করে আনিস উদ্দিনের নম্বরে ডায়াল করল। এতদিন পর কুহেলি বাবার সঙ্গে কথা বলতে পেরে বেজায় খুশি।

-“কাগজপত্র গুছিয়ে কুহেলি রেডি হচ্ছে—স্কুলে ভর্তি হতে হবে। ইশরাক আলমারি থেকে একটি বেগুনী রঙা শাড়ি বের করে কুহেলির হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, “আপাতত শাড়ি ছাড়া তো তেমন কিছুই নেই। এখন এটা পড়ে নিন, আজকে আপনার জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আর কিছু থ্রিপিস আমি রেডি করে নিয়ে আসব।”

কুহেলি শাড়ি পড়ে হালকা সেজেছে। ইশরাক আঁড়চোখে দেখে, কাজল হাতে নিয়ে এগিয়ে এলো। এবার মিনমিন করে বলল, “কাজলে হয়তো আপনাকে একটু বেশি সুন্দর লাগবে।”

-‘কুহেলি শুনে মৃদু হাসল, “তাহলে পড়িয়ে দিন।”

কিছুক্ষণের মধ্যে ওরা বাসা থেকে বের হলো। কুহেলি শাহবাগ মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে এডমিশন হয়ে গেছে, যা ইশরাকের হসপিটাল থেকে কাছেই। এরপর স্কুলের জন্য দর্জির কাছে ড্রেস রেডি করতে এসেছে। ইমারজেন্সি ভিত্তিতে, বিকেলে এসে নিয়ে যাবে।

“দুপুরে ওরা লাঞ্চের জন্য ভোজন বিলাস রেস্টুরেন্টে গেল। দুজনের প্রিয় খাবার—বিরিয়ানি অর্ডার করা হলো। খাবার শেষ করে, আবার শপিংমলে ঢুকল।

-‘ইশরাক কুহেলির জন্য বাসায় পড়ার টিশার্ট এবং কিছু থ্রিপিস কিনল। মোটামুটি সব কাজ শেষ করে বিকেল চারটার দিকে ওরা বাসায় ফেরার পথে স্কুল ড্রেস নিয়ে এসেছে।

একটি সুন্দর সন্ধ্যায় সূর্য পশ্চিম আকাশে ধীরে ধীরে অস্তাচল নেমে আকাশকে লাল, সোনালী ও গোলাপী রঙে রাঙিয়ে দিচ্ছে। চারিদিক শান্ত ও স্নিগ্ধ, দিনের কর্মব্যস্ততা শেষে সবাই প্রশান্তির কোলে আশ্রয় নিচ্ছে

‘প্রকৃতির এই সৌন্দর্য অন্তর মুগ্ধ করছিল এবং এক অনাবিল শান্তি অনুভূত হচ্ছে। কায়রা খানম ছেলে এবং বউয়ের সঙ্গে ভিডিও কলে আনন্দে মেতেছে।

ইয়াশার ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হলে বেড়াতে আসবে জানিয়েছে। কুহেলি আজ ভীষণ খুশি। ইশরাক পাশে বসে ল্যাপটপে ব্যস্ত। হঠাৎ করেই ইশরাকের ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে কপাল কুঁচকে কল বিচ্ছিন্ন করে আবার কাজে মন দিল।

-“বারবার ফোন বেজেই চলেছে। বাধ্য হয়ে ইশরাক ফোন নিয়ে বারান্দায় চলে এসেছে। একরাশ বিরক্তি নিয়ে কল রিসিভ করতেই মোহিনীর কান্না জড়িত কণ্ঠ ভেসে আসে,“সারাদিন কল করেছি, তুমি ফোন বন্ধ করে রেখেছ কেন?”

ইশরাক রুষ্টস্বরে জবাব দিল,“মোহিনী আমাকে আমার মতো ছেড়ে দাও, প্লিজ। তুমি কোনো রকম যোগাযোগ করবে না। আমি তোমার সঙ্গে আর কোনো সম্পর্ক রাখতে চাই না। এখন থেকে নিজের মতো বাঁচতে চাই।”

-“কিছুক্ষণ পর ইশরাক আরও স্পষ্ট করে জানাল, তুমি আধ ঘন্টার মধ্যে আমার বাসায় আসবে, নয়তো আমি ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে যাব।”এরপর মোহিনী কল বিচ্ছিন্ন করে দিল। এখন ফোনে ডিজে গান চালু করে উরাধুরা ডান্স করছে। শয়তানি হাসি হেসে একা-একা চেঁচিয়ে বলছে, “এত সহজে তোমায় ছাড়ছি না, ইশরাক। আমার আরও পাঁচ লাখ চাই।”

-“ইশরাক হতভম্ব হয়ে রইল, বুঝতে পারছে না এখন ওর কী করা উচিৎ। রুমে এসে একবার কুহেলির মুখের দিকে তাকাচ্ছে, আবার মোহিনীর কথা ভাবছে।

তারপর চিন্তিত কণ্ঠে বলল,“আমি একটু বাইরে যাচ্ছি, একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে। এক ঘন্টার মধ্যে ফিরে আসব।”ইশরাক কুহেলির উত্তর শোনার জন্য অপেক্ষা করেনি। দ্রুতগতিতে বেরিয়ে গেল।

-‘পরবর্তী অংশ নিয়ে খুব শীঘ্রই আসব….

0 0 votes
Article Rating
Loading spinner
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x